সংসার বা ব্যবসার তাগিদে পরিচিত বা স্বজনদের কাছ থেকে অর্থ ধার করা একটি সাধারণ ঘটনা। কিন্তু বিপত্তি ঘটে তখন, যখন দেনাদার সময়মতো টাকা ফেরত দেন না বা তালবাহানা শুরু করেন। ফলে নষ্ট হয় পারস্পরিক বিশ্বাস, আর শেষ ভরসা হিসেবে পাওনাদারকে পা বাড়াতে হয় আদালতের বারান্দায়।
অনেকের ধারণায় একটি বিভ্রান্তি কাজ করে—সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইন (The Specific Relief Act, 1877)-এ চুক্তি প্রবল বা সম্পত্তি উদ্ধারের মতো বিভিন্ন প্রতিকারের কথা থাকলেও সরাসরি ‘টাকা ফেরত পাওয়া’র বিষয়ে স্পষ্ট কিছু বলা নেই। তবে এর মানে এই নয় যে আইন পাওনাদারকে নিঃস্ব করে ছেড়ে দিয়েছে। দেশের প্রচলিত একাধিক আইনের সমন্বিত প্রয়োগে পাওনা টাকা আদায়ের শক্ত আইনি ভিত্তি রয়েছে।
দেওয়ানী কার্যবিধি, ১৯০৮ (The Code of Civil Procedure, 1908)-এর ৯ ধারা অনুযায়ী, ধারের টাকা সংক্রান্ত যাবতীয় বিরোধ দেওয়ানী প্রকৃতির (Civil Dispute)। তাই পাওনাদার খুব সহজেই দেওয়ানী আদালতে অর্থ জারির বা টাকা আদায়ের মামলা করতে পারেন।
দেওয়ানী কার্যবিধির আদেশ ৭, বিধি ২ অনুযায়ী টাকার মামলার আরজি (Plaint) কীভাবে লিখতে হবে তার স্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে। এখানে পাওনা টাকার সঠিক হিসাব ও লেনদেনের পটভূমি তুলে ধরতে হয়।
দ্য কোর্ট ফিস অ্যাক্ট, ১৮৭০ (The Court-fees Act, 1870)-এর ৭(১) ধারা অনুসারে দাবিকৃত মোট টাকার পরিমাণের ওপর ভিত্তি করে নির্দিষ্ট হারে অ্যাড-ভ্যালোরম (Ad-valorem) বা মূল্যভিত্তিক কোর্ট ফি জমা দিয়ে মামলাটি রূপ দিতে হয়। দ্য লিমিটেশন অ্যাক্ট, ১৯০৮ (The Limitation Act, 1908)-এর প্রথম তফসিলের ৫৭ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, টাকা ধার দেওয়ার তারিখ থেকে ৩ বছরের মধ্যে আদালতে মামলা দায়ের করতে হয়। এই মেয়াদ পেরিয়ে গেলে আইনগত প্রতিকার পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।
টাকা আদায়ে দেনাদারকে আটকের সুযোগ থাকলেও দেওয়ানী কার্যবিধির ৫৬ ধারা অনুযায়ী কোনো নারী দেনাদারকে অর্থ জারির মামলায় গ্রেপ্তার বা কারাগারে আটক রাখা যায় না। তবে পুরুষ দেনাদারের ক্ষেত্রে আদালতের মাধ্যমে আটক ও সম্পত্তি বাজেয়াপ্তের বিধান রয়েছে।
বিকল্প ও দ্রুত প্রতিকারের উপায়-
ধার নেওয়ার সময় দেনাদার কোনো চেক প্রদান করে থাকলে এবং তা ব্যাংকে প্রত্যাখ্যাত হলে দ্য নেগোশিয়েবল ইনস্ট্রুমেন্টস অ্যাক্ট, ১৮৮১ (NI Act)-এর ১৩৮ ধারায় দ্রুত বিচারিক প্রক্রিয়ায় ফৌজদারি মামলা করা যায়।
অসৎ উদ্দেশ্যে ধার নিয়ে টাকা আত্মসাৎ করলে পেনাল কোড, ১৮৬০-এর ৪০৬ (বিশ্বাসভঙ্গ) ও ৪২০ (প্রতারণা) ধারায় ফৌজদারি অভিযোগ আনার সুযোগও উন্মুক্ত রয়েছে।
সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইনে সরাসরি অনুচ্ছেদ না থাকলেও দেওয়ানী কার্যবিধি, কোর্ট ফি আইন ও তামাদি আইনের যথাযথ সমন্বয়ে পাওনা টাকা উদ্ধার করা সম্পূর্ণরূপে সম্ভব। আইন সচেতনতাই পারে আপনার কষ্টার্জিত অর্থ নিরাপদে ফেরত এনে দিতে।
লেখকঃ সাইফুল আলম
আইনজীবী
০১৭১১৯৪২২৯৪, [email protected]

