আজকের ডেস্কঃ দীর্ঘ ১৭ বছরের নির্বাসিত জীবন শেষে এক ভিন্ন বাস্তবতায় দেশে ফিরেছেন বিএনপির বর্তমান কাণ্ডারি তারেক রহমান। কণ্ঠস্বরে আগের সেই তেজ হয়তো কিছুটা ম্লান, শরীরে ক্লান্তির ছাপ—তবুও ২০২৬-এর বাংলাদেশের রাজনীতিতে সবচেয়ে আলোচিত ও শক্তিশালী নাম তিনি। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে টাইম ম্যাগাজিন তার এক বিশেষ প্রতিবেদনে তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তন এবং বাংলাদেশের আগামীর গতিপথ নিয়ে বিস্তারিত আলোকপাত করেছে।
এক আবেগময় প্রত্যাবর্তন
গত ২৫ ডিসেম্বর ঢাকার আকাশে যখন তারেক রহমানকে বহনকারী বিমানটি অবতরণ করে, তখন বিমানবন্দরের বাইরে অপেক্ষমাণ লাখো মানুষের উপস্থিতি জানান দিচ্ছিলো দেশের রাজনৈতিক মেরুকরণ কোন দিকে। তবে এই আনন্দের রেশ কাটতে না কাটতেই ৫ দিনের মাথায় মা, বেগম খালেদা জিয়ার চিরবিদায় তার এই ফেরাকে করে তুলেছে অত্যন্ত আবেগঘন। মায়ের শেষ ইচ্ছা ও দেশপ্রেমের মন্ত্রকে পাথেয় করেই তিনি এখন আগামীর পথে হাঁটছেন।
সাম্প্রতিক জরিপগুলোতে দেখা যাচ্ছে, রাজনৈতিক মাঠে বিএনপির জনপ্রিয়তা এখন আকাশচুম্বী। ডিসেম্বরের এক জরিপ অনুযায়ী:
বিএনপির জনসমর্থন: প্রায় ৭০%, জামায়াতে ইসলামীর সমর্থন: প্রায় ১৯%
এই পরিসংখ্যান স্পষ্ট ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, আসন্ন নির্বাচনে তারেক রহমানই সরকার গঠনের দৌড়ে সবচেয়ে এগিয়ে থাকা প্রার্থী। তবে এই বিশাল জনপ্রিয়তার মাঝেও উঁকি দিচ্ছে ২০০১-০৬ মেয়াদের সেই বিতর্কিত স্মৃতি। দুর্নীতি ও স্বৈরাচারী শাসনের পুনরাবৃত্তি ঘটবে কি না, সেই শঙ্কা এখনও অনেক সংস্কারপন্থী নাগরিকের মনে বিদ্যমান।
অর্থনীতির চ্যালেঞ্জ ও তারেক রহমানের ‘ভিশন’
বাংলাদেশ বর্তমানে একটি কঠিন অর্থনৈতিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। মুদ্রাস্ফীতি, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সংকট এবং ১৩.৫% যুব বেকারত্ব—এই ত্রিমুখী সংকট মোকাবিলাই হবে নতুন সরকারের প্রধান কাজ। তারেক রহমান এই সংকট উত্তরণে গতানুগতিক রাজনীতির বাইরে গিয়ে কিছু সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনার কথা বলেছেন:
পরিবেশ ও উন্নয়ন: দেশব্যাপী খাল খনন ও বনায়ন কর্মসূচি। জ্বালানি: বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন। মানবসস্পদ: প্রবাসী কর্মীদের দক্ষতা বৃদ্ধি ও স্বাস্থ্যখাতে নতুন অংশীদারত্ব।
তিনি আত্মবিশ্বাসের সাথে জানিয়েছেন, “আমার পরিকল্পনার ৩০ শতাংশও যদি বাস্তবায়ন করতে পারি, তবে মানুষ আমাকে পূর্ণ সমর্থন দেবে।”
জুলাই বিপ্লব পরবর্তী বাংলাদেশে ইসলামপন্থি শক্তির উত্থান এক নতুন বাস্তবতা তৈরি করেছে। জামায়াতের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং ক্যাম্পাসগুলোতে ছাত্র শিবিরের সক্রিয়তা রাজনীতিতে নতুন সমীকরণ যোগ করেছে। পাশাপাশি মব ভায়োলেন্স এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি সাধারণ মানুষের মনে নিরাপত্তাহীনতা তৈরি করেছে। তারেক রহমান এই প্রেক্ষাপটে ‘আইনের শাসন’ প্রতিষ্ঠাকেই তার অগ্রাধিকার হিসেবে ঘোষণা করেছেন।
তারেক রহমানের জন্য পররাষ্ট্রনীতি হবে এক বড় অ্যাসিড টেস্ট।
ভারত: শেখ হাসিনাকে আশ্রয় দেওয়া এবং পূর্ববর্তী একপাক্ষিক সম্পর্কের কারণে তরুণ প্রজন্মের মাঝে ভারত বিরোধী মনোভাব প্রবল। এই বৈরী জনমতের সাথে রাষ্ট্রীয় সম্পর্কের ভারসাম্য রক্ষা করা তার জন্য কঠিন হবে।
যুক্তরাষ্ট্র: ট্রাম্প প্রশাসনের ২০% শুল্ক আরোপ বাংলাদেশের রপ্তানি খাতের জন্য উদ্বেগের। তবে বোয়িং বিমান কেনা এবং জ্বালানি খাতে সহযোগিতার মাধ্যমে ওয়াশিংটনের সাথে সম্পর্ক ঝালাই করার কৌশলগত ইঙ্গিত দিয়েছেন তিনি।
তারেক রহমান বুঝতে পারছেন, শুধু জিয়ার উত্তরাধিকার হওয়া আজকের জেন-জি প্রজন্মের কাছে যথেষ্ট নয়। ক্ষমতার উচ্চতা যেমন বেড়েছে, মানুষের প্রত্যাশার ভারও তেমনি প্রবল। ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন কেবল বিএনপির ক্ষমতায় ফেরার লড়াই নয়, বরং এটি তারেক রহমানের নিজের ভাবমূর্তি স্বচ্ছ করার এবং একটি স্থিতিশীল বাংলাদেশ গড়ার চূড়ান্ত পরীক্ষা।

