ভারতে যাচ্ছে না বাংলাদেশ: বিশ্বকাপে খেলার চেয়ে নিরাপত্তা বড় ও নিষেধাজ্ঞার শঙ্কা: কোন পথে বাংলাদেশের ক্রিকেট?

0
বিসিসিআই-এর আধিপত্য বনাম বাংলাদেশের আত্মমর্যাদা: মাঠের খেলা যখন রাজনৈতিক দাবার ঘুঁটি

ক্রীড়া প্রতিবেদকঃ নিরাপত্তার প্রশ্নে কোনো আপস নয়—এই নীতিতে অটল থেকে আসন্ন টি-টুয়েন্টি বিশ্বকাপ বর্জনের চূড়ান্ত বার্তা দিল বাংলাদেশ। আইসিসি ভেন্যু পরিবর্তনের দাবি নাকচ করে দেওয়ার পর বিসিবি ও সরকারের পক্ষ থেকে সাফ জানিয়ে দেওয়া হয়েছে, বর্তমান পরিস্থিতিতে ভারতে গিয়ে ম্যাচ খেলা সম্ভব নয়। গতকাল বিকেলে ক্রিকেটারদের সঙ্গে রুদ্ধদ্বার বৈঠক শেষে যুব ও ক্রীড়া উপদেষ্টা অধ্যাপক আসিফ নজরুল সরকারের এই চূড়ান্ত অবস্থানের কথা সংবাদমাধ্যমকে নিশ্চিত করেন।

আইসিসিকে দেওয়া ২৪ ঘণ্টার আলটিমেটাম শেষেও নিজেদের অবস্থান বদলায়নি বাংলাদেশ। ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ নজরুল বলেন, “আমাদের সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের কোনো সুযোগ নেই। আইসিসি ভেন্যু না বদলালে বাংলাদেশ এই বিশ্বকাপে অংশ নেবে না।” মূলত ভারতের মাটিতে বাংলাদেশি ক্রিকেটারদের ওপর উগ্রবাদী গোষ্ঠীর হুমকির আশঙ্কা এবং মোস্তাফিজুর রহমানকে আইপিএল থেকে বাদ দেওয়ার ঘটনার পর থেকেই এই অস্থিরতার শুরু। সরকারের মতে, ভারতের নিরাপত্তা পরিস্থিতি এখনো ক্রিকেট খেলার অনুকূলে নেই।

আইসিসির ‘ডিসপিউট রেজোল্যুশন’ কমিটির দ্বারস্থ বিসিবিঃ আইসিসি তাদের সিদ্ধান্তে অনড় থাকলেও হাল ছাড়ছে না বিসিবি। গতকালই এক ই-মেইলের মাধ্যমে বিসিবি অনুরোধ করেছে, ভেন্যু পরিবর্তনের এই বিষয়টি যেন আইসিসির স্বাধীন ‘ডিসপিউট রেজোল্যুশন কমিটি’ বা বিরোধ নিষ্পত্তি কমিটির কাছে পাঠানো হয়। বিসিবির আশা, স্বাধীন আইনজীবীদের এই প্যানেল পরিস্থিতির গুরুত্ব বিবেচনায় বাংলাদেশের দাবির পক্ষে রায় দেবে।

বিসিবি সভাপতি আমিনুল ইসলাম বলেন, “আমরা খেলার জন্য শতভাগ প্রস্তুত, তবে ভারতের বদলে আমাদের ম্যাচগুলো শ্রীলঙ্কায় সরিয়ে নিতে হবে। আমাদের এই আইনি লড়াই চলবে।”

অনুষ্ঠিত বৈঠকে জাতীয় দলের ক্রিকেটারদের বর্তমান পরিস্থিতির প্রেক্ষাপট ব্যাখ্যা করেন ক্রীড়া উপদেষ্টা। জানা গেছে, ক্রিকেটাররা সরকারের এই কঠোর অবস্থানের প্রতি পূর্ণ সমর্থন জানিয়েছেন। খেলোয়াড়দের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, মাঠে খেলাটাই তাদের প্রধান কাজ হলেও, রাষ্ট্র ও ক্রিকেট বোর্ড তাদের অভিভাবক। ফলে অভিভাবক হিসেবে সরকার যে সিদ্ধান্ত নেবে, তা তারা মেনে নেবেন।

একনজরে বর্তমান সংকট:

ভেন্যু বিতর্ক: বাংলাদেশের প্রথম পর্বের ৪টি ম্যাচ কলকাতা ও মুম্বাইয়ে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা।

বিসিবির বিকল্প: বাংলাদেশ তাদের ম্যাচগুলো শ্রীলঙ্কায় খেলার প্রস্তাব দিয়েছে।

বিসিসিআই-এর নীরবতা: পুরো বিষয়টিতে ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড শুরু থেকেই কোনো মন্তব্য করা থেকে বিরত রয়েছে।

চূড়ান্ত সময়সীমা: আগামী ৭ ফেব্রুয়ারি থেকে ভারত ও শ্রীলঙ্কায় বিশ্বকাপ শুরু হওয়ার কথা।

যদি শেষ পর্যন্ত আইসিসি তাদের অবস্থানে অনড় থাকে এবং বিরোধ নিষ্পত্তি কমিটি থেকেও ইতিবাচক কোনো সংকেত না আসে, তবে এবারের টি-টুয়েন্টি বিশ্বকাপে লাল-সবুজের জার্সি আর দেখা যাবে না।

আইসিসির অনমনীয়তা ও নিষেধাজ্ঞার শঙ্কা: কোন পথে বাংলাদেশের ক্রিকেট?

বাংলাদেশ যদি শেষ পর্যন্ত বিশ্বকাপ বর্জনের সিদ্ধান্তে অটল থাকে, তবে আইসিসির পক্ষ থেকে বড় ধরনের আর্থিক ও প্রশাসনিক শাস্তির মুখে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। আইসিসির গঠনতন্ত্র অনুযায়ী, কোনো দেশ যুক্তিসঙ্গত কারণ ছাড়া বৈশ্বিক টুর্নামেন্টে অংশ না নিলে তাদের সদস্যপদ স্থগিত বা বিশাল অঙ্কের জরিমানা করা হতে পারে।

বিসিবির আইনি লড়াইয়ের কৌশলঃ

বিসিবি মূলত আইসিসির ‘পার্টিসিপেশন এগ্রিমেন্ট’ বা অংশগ্রহণ চুক্তির একটি বিশেষ ধারাকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছে। সেখানে বলা আছে, যদি কোনো আয়োজক দেশ অংশগ্রহণকারী দলের খেলোয়াড়দের ‘যথাযথ নিরাপত্তা’ দিতে ব্যর্থ হয়, তবে সেই দল টুর্নামেন্ট থেকে সরে দাঁড়ানোর অধিকার রাখে। বিসিবি দাবি করছে, মোস্তাফিজুর রহমানকে আইপিএল থেকে সরিয়ে দেওয়া এবং উগ্রবাদীদের হুমকিই প্রমাণ করে যে ভারতে নিরাপত্তা ঝুঁকি বিদ্যমান।

বিশ্বকাপে অংশ না নিলে বাংলাদেশ বড় ধরনের ক্ষতির সম্মুখীন হতে পারে:

আইসিসি রেভিনিউ শেয়ার: টুর্নামেন্ট থেকে প্রাপ্ত লভ্যাংশ হারানো।

র‍্যাঙ্কিং বিপর্যয়: পয়েন্ট না পাওয়ায় টি-টুয়েন্টি র‍্যাঙ্কিংয়ে বড় ধরনের অবনমন।

দ্বিপাক্ষিক সিরিজের ওপর প্রভাব: অন্যান্য দেশগুলোও নিরাপত্তার অজুহাতে বাংলাদেশে আসার ক্ষেত্রে কড়াকড়ি আরোপ করতে পারে।

পরবর্তী পদক্ষেপ: ডিসপিউট রেজোল্যুশন কমিটি আইসিসির স্বাধীন আইনজীবীদের নিয়ে গঠিত এই কমিটিই এখন বাংলাদেশের শেষ ভরসা। যদি এই কমিটি বিসিবির দাবির পক্ষে কোনো রায় না দেয়, তবে বিষয়টি আন্তর্জাতিক ক্রীড়া আদালত বা কোর্ট অফ আরবিট্রেশন ফর স্পোর্ট (CAS) পর্যন্ত গড়াতে পারে।

বিসিবির এক কর্মকর্তা জানান, “আমরা কেবল একটি আসর বর্জনের কথা বলছি না, আমরা আমাদের খেলোয়াড়দের জীবনের নিরাপত্তার কথা বলছি। প্রয়োজনে আমরা আন্তর্জাতিক আদালত পর্যন্ত যাব।”