
পিরোজপুর প্রতিনিধি: একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় প্রয়াত জামায়াত নেতা আল্লামা দেলোয়ার হোসেন সাঈদীর বিরুদ্ধে মূল বাদী ও রাষ্ট্রপক্ষের অন্যতম প্রধান সাক্ষী বীর মুক্তিযোদ্ধা মানিক পশারীর (৮৭) দাফন সম্পন্ন হয়েছে। তীব্র ক্ষোভ, বিক্ষোভ ও চরম উত্তেজনার মুখে মৃত্যুর দীর্ঘ ১৭ ঘণ্টা পর শনিবার (২৪ অক্টোবর) দিবাগত রাত ২টার দিকে পিরোজপুর সদর উপজেলার শংকরপাশা ইউনিয়নের চিতলিয়া গ্রামে কড়া পুলিশ পাহারায় তার শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়।
কোনো পুরুষ সদস্য সামনে না আসায় শেষ পর্যন্ত নিহতের স্ত্রী, কন্যা ও বোনেরা মিলে নিজ হাতে কবর খুঁড়ে রাত ২টার দিকে লাশ দাফন করেন।
পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের পর থেকে আইনি ও রাজনৈতিক কারণে আত্মগোপনে ছিলেন মানিক পশারী। প্রথমে যশোর এবং পরবর্তীতে গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় মেয়ের জামাতার আশ্রয়ে থাকেন তিনি। গত দুই মাস ধরে তিনি মারাত্মক বার্ধক্যজনিত অসুস্থতায় ভুগছিলেন।
শনিবার সকাল ১০টার দিকে টুঙ্গিপাড়ায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। এরপর দুপুর ১২টার দিকে তার মরদেহ পিরোজপুর সদর উপজেলা পরিষদ চত্বরে নিয়ে আসা হলে স্থানীয় জামায়াত-শিবিরের নেতাকর্মী ও উত্তেজিত জনতা বাধা দেন। সেখানে হট্টগোল ও লাশ ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টার পরিস্থিতি তৈরি হলে উপজেলা প্রশাসন ও পুলিশ নিরাপত্তার স্বার্থে মরদেহ সরিয়ে পিরোজপুর পুলিশ লাইনসে নিয়ে যায়।
উপজেলা চত্বরে বাধা পাওয়ার পর পিরোজপুর পুলিশ লাইনসের অভ্যন্তরে কড়া নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে বিকেল ৫টার দিকে গেজেটেড এই বীর মুক্তিযোদ্ধাকে গোপনে ‘গার্ড অব অনার’ বা রাষ্ট্রীয় মর্যাদা দেওয়া হয়।
মরদেহ একটি সাধারণ অ্যাম্বুলেন্সে প্রয়োজনীয় হিমাগার বা বরফ ছাড়াই দীর্ঘ ৪-৫ ঘণ্টা পড়ে থাকায় পরিবারের স্বজনরা ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করেন। পরবর্তীতে পুলিশ লাইনসে বিকেল থেকে রাত ১টা পর্যন্ত অতিরিক্ত সতর্কতায় লাশ ঘিরে রাখা হয়।
নিহতের বোন ও স্বজনদের অভিযোগে উঠে এসেছে এক মর্মান্তিক দৃশ্যপট। নিহতের বোন জানান “আমার ভাইকে টুঙ্গিপাড়া থেকে পিরোজপুর আনার পরই ঝামেলা শুরু হয়। আমরা একবার বাড়ির ভিটায় কবর খুঁড়ছিলাম, কিন্তু উত্তেজিত লোকজন এসে সেই কবর আবার মাটি দিয়ে ভরাট করে ফেলে। বাধ্য হয়ে রাতে আবার নিজেদেরই মাটি কাটতে হয়েছে। পুলিশ রাতে লাশ পৌঁছে দেওয়ার পর কোনো পুরুষ মানুষ এগিয়ে না আসায় মোরাই (আমরা নারীরাই) কবর খুঁড়ে লাশ মাটিতে নেমে দাফন শেষ করেছি।”
অবশেষে রাত ১টার দিকে সদর থানা পুলিশ জেলা জামায়াত নেতাদের সহযোগিতায় মরদেহ গ্রামের বাড়িতে নিয়ে পৌঁছায় এবং রাত ২টার দিকে স্বজনদের উপস্থিতিতে দাফন কাজ শেষ হয়।
পিরোজপুর জেলা জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি আব্দুর রাজ্জাক বাধার বিষয়টি অস্বীকার করে বলেন, “মানিক পশারীর লাশ দাফনে পিরোজপুর জেলা জামায়াত বা অঙ্গ সংগঠনের কোনো নেতাকর্মী বাধা দেয়নি। জামায়াতে ইসলামী লাশের রাজনীতিতে বিশ্বাস করে না। আমরা সদর থানা পুলিশকে পুরোপুরি সহযোগিতা করে দাফন কাজ সম্পন্ন করিয়েছি।” তবে পূর্বে তিনি মানিক পশারীকে ‘ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা’ বলে দাবি করেছিলেন।
পিরোজপুর সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. শরিফুল ইসলাম জানান, “আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রেখে নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা বলয়ের মধ্য দিয়ে দাফন সম্পন্ন করা হয়েছে। যেকোনো অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে কবরের আশপাশে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন রাখা রয়েছে।”
