চট্টগ্রাম প্রতিনিধিঃ চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের দুর্গম ‘জঙ্গল সলিমপুর’ ফের রক্তাক্ত। সোমবার বিকেলে দখলদার ও অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীদের অতর্কিত হামলায় মোতালেব নামে র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র্যাব) এক ডিএডি (ডেপুটি অ্যাসিস্ট্যান্ট ডিরেক্টর) নিহত হয়েছেন। এ ঘটনায় আরও কয়েকজন র্যাব সদস্য আহত হয়েছেন এবং তিন সদস্যকে জিম্মি করার খবর পাওয়া গেছে। বর্তমানে পুরো এলাকা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে থাকলেও থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে।
র্যাব সূত্র জানায়, সোমবার বিকেলে পতেঙ্গা ব্যাটালিয়নের (র্যাব-৭) একটি দল নিয়মিত অভিযানের অংশ হিসেবে জঙ্গল সলিমপুরের ছিন্নমূল এলাকায় প্রবেশ করে। আগে থেকে ওত পেতে থাকা সন্ত্রাসীরা আড়াল থেকে অতর্কিত গুলিবর্ষণ শুরু করে। এতে মাথায় ও শরীরের বিভিন্ন অংশে গুলিবিদ্ধ হয়ে গুরুতর আহত হন ডিএডি মোতালেব। তাকে দ্রুত উদ্ধার করে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।
চট্টগ্রাম জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) সিরাজুল ইসলাম ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সেখানে অতিরিক্ত ফোর্স পাঠানো হয়েছে।
হামলার একপর্যায়ে র্যাবের তিন সদস্যকে সন্ত্রাসীরা জিম্মি করে দুর্গম পাহাড়ের ভেতরে নিয়ে যায় বলে জানা গেছে। খবর পেয়ে সীতাকুণ্ড থানা পুলিশ ও র্যাবের বিশাল একটি বহর যৌথ অভিযান শুরু করে। পুলিশের তথ্যমতে, ঘটনার পর থেকে পাহাড়ি এলাকায় অপরাধীদের ধরতে সাড়াশি অভিযান চলছে। সীতাকুণ্ড থানার ওসি মো. মহিনুল ইসলাম জানান, “পুলিশ ও র্যাব যৌথভাবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কাজ করছে। জিম্মি হওয়া সদস্যদের উদ্ধারে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।”
গত চার দশক ধরে পাহাড় কেটে গড়ে তোলা জঙ্গল সলিমপুর বর্তমানে জেলা প্রশাসন ও পুলিশের কাছে এক ‘নিষিদ্ধ নগরী’ হিসেবে পরিচিত। এখানে প্রবেশের ক্ষেত্রে বহিরাগত এমনকি প্রশাসনের কর্মকর্তাদেরও বাধার সম্মুখীন হতে হয়।
নিজস্ব শাসন: এখানে বসবাসকারীদের জন্য রয়েছে বিশেষ পরিচয়পত্র। নিয়ন্ত্রক: আলীনগর বহুমুখী সমিতির নেতৃত্বে থাকা শীর্ষ সন্ত্রাসী ইয়াসিন মিয়া এবং মহানগর ছিন্নমূল বস্তিবাসী সংগ্রাম পরিষদের কাজী মশিউর ও গাজী সাদেকের নিয়ন্ত্রণে চলে এই অপরাধপুরী। সংগঠিত অপরাধ: পাহাড় কাটা, প্লট বাণিজ্য এবং অবৈধ বসতি স্থাপন করে প্রায় ৩০ হাজার সদস্যের একটি বাহিনী এখানে সক্রিয়।
প্রশাসনের ওপর হামলার ঘটনা এটিই প্রথম নয়। জঙ্গল সলিমপুরে প্রবেশমুখে অতন্দ্র পাহারাদারদের মাধ্যমে সংকেত পেয়ে সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা পাহাড়ের ওপর থেকে পাথর ও ককটেল হামলা চালায়।
২০২৩ সাল: উচ্ছেদ অভিযান শেষে ফেরার পথে ম্যাজিস্ট্রেট ও ওসিসহ ২০ জনের ওপর হামলা। ২০২২ সাল: র্যাব ও পুলিশের ওপর একাধিকবার রক্তক্ষয়ী হামলা।
প্রশাসনের পক্ষ থেকে বারংবার অভিযান চালানো হলেও ভৌগোলিক অবস্থান এবং সশস্ত্র ক্যাডার বাহিনীর শক্ত অবস্থানের কারণে এই জনপদটি এখনো রাষ্ট্রের মূল নিয়ন্ত্রণের বাইরে থেকে গেছে। সোমবারের এই হত্যাকাণ্ড সলিমপুরের দখলদারদের দুঃসাহস কোন পর্যায়ে পৌঁছেছে, তারই প্রমাণ দেয়।

