রংপুরে ডজন দেড়েক সরকারি চিকিৎসক উধাও: কেউ বিদেশে, কেউ প্রাইভেটে, ভোগান্তিতে রোগীরা

0
রংপুরে ডজন দেড়েক সরকারি চিকিৎসক উধাও: কেউ বিদেশে, কেউ প্রাইভেটে, ভোগান্তিতে রোগীরা

জয়নাল আবেদীনঃ রংপুর বিভাগের বিভিন্ন সরকারি স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের অন্তত ২০ জন চিকিৎসক বছরের পর বছর ধরে কোনো ধরনের অনুমোদন ছাড়াই কর্মস্থলে অনুপস্থিত রয়েছেন। সরকারি চাকরিবিধি অনুযায়ী টানা দুই মাসের বেশি অননুমোদিত অনুপস্থিতির জন্য বিভাগীয় শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার বিধান থাকলেও, এই চিকিৎসকদের কারও ক্ষেত্রে ৬ বছর, আবার কারও ক্ষেত্রে ১০ বছর পার হয়ে গেলেও কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, নিখোঁজ এসব চিকিৎসকদের কেউ বর্তমানে বিদেশে পাড়ি জমিয়েছেন, কেউ দেশে থেকে নিজের প্রাইভেট ক্লিনিকে পসার জমিয়েছেন, আবার কারও হদিস খোদ স্বাস্থ্য বিভাগও জানে না।

হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, মেডিকেল অফিসার ডা. শাহেদুর রহমান ২০১৯ সালের ১৩ জানুয়ারি, ডা. আব্দুল কাদের তালুকদার একই বছরের ৫ মার্চ এবং ডা. আবু সাদাত মো. সায়েদ শরীফ ২৬ এপ্রিল থেকে বিনা অনুমতিতে কর্মস্থলে অনুপস্থিত। বোদা উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা মো. লুৎফুল কবীর বলেন, আমি যোগদানের পর থেকেই ওই তিন চিকিৎসককে কর্মস্থলে পাইনি। তাদের বিরুদ্ধে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকেও জানানো হয়েছে। তাদের কোনো খোঁজখবরও পাওয়া যায়নি।

তবে কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকা ডা. আব্দুল কাদের তালুকদার বর্তমানে রংপুর নগরীর ধাপ এলাকায় তার মালিকানাধীন তালুকদার হাসপাতালে নিয়মিত রোগী দেখছেন।কেন সরকারি কর্মস্থলে যাচ্ছেন না, এ প্রশ্নে ডা. আব্দুল কাদের তালুকদার বলেন, আমাকে দূরে বদলি করা হয়েছিল। পদোন্নতি দেওয়া হয়নি। এজন্য আর সেখানে যাইনি। এখন সরকার চাইলে যে কোনো ব্যবস্থা নিতে পারে।অন্যদিকে ডা. শাহেদুর রহমানের বর্তমান অবস্থান সম্পর্কে কোনো তথ্য দিতে পারেননি বোদা উপজেলা হাসপাতাল ও পঞ্চগড় জেলা সিভিল সার্জন অফিস। কর্মস্থলে দেওয়া তার মোবাইল নম্বরও বন্ধ পাওয়া গেছে। আরেক চিকিৎসক ডা. আবু সাদাত মো. সায়েদ শরীফ পাভেল প্রায় ছয় বছর আগে সপরিবারে কানাডায় চলে গেছেন বলে জানিয়েছেন তার স্বজনেরা। ডা. শরীফের বোনজামাই ও দেবীগঞ্জ উপজেলার সাকোয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান হাফিজুল ইসলাম বলেন, শরীফ প্রায় ছয় বছর আগে পরিবার নিয়ে কানাডায় চলে গেছে। বর্তমানে সেখানেই আছে।

শুধু পঞ্চগড় নয়, একই চিত্র রংপুর বিভাগের অন্যান্য জেলাতেও। দিনাজপুরের বিরামপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসক ডা. অনন্যা রায় প্রায় ১০ বছর ধরে কর্মস্থলে অনুপস্থিত। তিনি বর্তমানে পরিবারসহ জাপানে অবস্থান করছেন বলে জানা গেছে।রংপুরের তারাগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসক ডা. আ.ন.ম. কায়সার আনামও ছয় বছর ধরে কর্মস্থলে নেই। স্বজনদের ভাষ্য, তিনি বর্তমানে লন্ডনে রয়েছেন।ডা. আনামের চাচা কামাল তৌফিকুল ইসলাম বলেন, করোনার সময়ের পর তিনি লন্ডনে গেছেন।রংপুরের কাউনিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের মেডিকেল অফিসার ডা. আসাদুজ্জামান আসাদ প্রায় এক বছর ধরে কর্মস্থলে অনুপস্থিত থেকে ঢাকার সিকেডি ইউরোজলি হাসপাতালে কর্মরত রয়েছেন। এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, পারিবারিক কারণে ঢাকায় আছি। প্রয়োজন হলে চাকরি ছেড়ে দেব।

রংপুর বিভাগীয় স্বাস্থ্যদফতরের একটি সূতে পাওয়া ঠাকুরগাঁও, নীলফামারী, লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম ও গাইবান্ধার বিভিন্ন সরকারি হাসপাতালেও দীর্ঘদিন ধরে অনুপস্থিত রয়েছেন ১০ জন

এই দীর্ঘস্থায়ী অনুপস্থিতির কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে প্রান্তিক অঞ্চলের সাধারণ রোগীরা। যেমন—পঞ্চগড়ের বোদা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসকের অনুমোদিত পদ ৪২টি থাকলেও কাগজে-কলমে আছেন ১৯ জন। কিন্তু এই অনুপস্থিতির গ্যাঁড়াকলে পড়ে বাস্তবে সেখানে মাত্র ১৪ জন চিকিৎসক সেবা দিচ্ছেন।

অভিযুক্ত চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত বরখাস্তের মতো ব্যবস্থা না নেওয়ায় পদগুলো শূন্য ঘোষণা করা যাচ্ছে না। ফলে ওই পদগুলোতে নতুন কোনো চিকিৎসক নিয়োগ দেওয়াও সম্ভব হচ্ছে না। এতে স্বাস্থ্যসেবার সংকট দিন দিন আরও তীব্র হচ্ছে।

বোদা উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা মো. লুৎফুল কবীর জানান, তিনি যোগদানের পর থেকেই এই চিকিৎসকদের পাননি এবং তাদের কোনো খোঁজও নেই।

রংপুর বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) ডা. ওয়াজেদ আলী এ প্রসঙ্গে বলেন, “বিভাগে প্রায় ২০ জন চিকিৎসক দীর্ঘদিন ধরে অনুপস্থিত রয়েছেন। আমরা তাদের কারণ দর্শানোর নোটিশ (শোকজ) দিয়েছি এবং পুরো বিষয়টি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরকে লিখিতভাবে জানানো হয়েছে। যেহেতু এটি ক্যাডার কর্মকর্তাদের বিষয়, তাই পরবর্তী চূড়ান্ত ব্যবস্থা নেওয়ার এখতিয়ার অধিদপ্তর ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের।”