খারগ দ্বীপে মার্কিন অভিযানের পদধ্বনি: পারস্য উপসাগরে যুদ্ধের মেঘ নাকি ট্রাম্পের নিছকই ‘ধোঁকাবাজি’?

0
খারগ দ্বীপে মার্কিন অভিযানের পদধ্বনি: পারস্য উপসাগরে যুদ্ধের মেঘ নাকি ট্রাম্পের নিছকই ‘ধোঁকাবাজি’?

আন্তর্জাতিক ডেস্কঃ পারস্য উপসাগরের ভূ-রাজনীতিতে নতুন উত্তাপ ছড়িয়েছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের একটি সাম্প্রতিক ইঙ্গিত। ইরানের অর্থনীতির প্রাণভোমরা হিসেবে পরিচিত ‘খারগ দ্বীপ’ (Kharg Island) নিয়ন্ত্রণে নিতে মার্কিন সেনা পাঠানোর সম্ভাবনার কথা জানিয়েছেন তিনি। কিন্তু প্রশ্ন উঠছে, মার্কিন প্রেসিডেন্টের এই সমর-তৎপরতার নেপথ্যে প্রকৃত রণকৌশল কী? এটি কি কোনো দীর্ঘমেয়াদী যুদ্ধের সূচনা, নাকি তেহরানকে আলোচনার টেবিলে বসানোর এক বিশাল মনস্তাত্ত্বিক চাপ?

ইরানের জন্য খারগ দ্বীপ কেবল একটি ভূখণ্ড নয়, বরং এটি তাদের টিকে থাকার মেরুদণ্ড।ইরানের মোট তেল রফতানির প্রায় ৯০ শতাংশই এই দ্বীপের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়। এখানকার গভীর জলসীমায় ‘ভেরি লার্জ ক্রুড ক্যারিয়ার’ (VLCC) নামক দানবীয় তেলের ট্যাঙ্কারগুলো ভিড়তে পারে, যার প্রতিটি ২০ লাখ ব্যারেল তেল বহনে সক্ষম। এই দ্বীপের নিয়ন্ত্রণ নিতে পারলে ইরানকে অর্থনৈতিকভাবে পঙ্গু করে দেওয়া সম্ভব। বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র চাচ্ছে এই দ্বীপটি সাময়িকভাবে নিয়ন্ত্রণে নিয়ে তেহরানকে ‘হরমুজ প্রণালী’র ওপর থেকে নিয়ন্ত্রণ শিথিল করতে বাধ্য করতে।

ট্রাম্পের এই হুমকির জবাবে চুপ করে নেই ইরানও। ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) এবং ইরানের শীর্ষ নেতারা তাদের প্রতিরক্ষা বলয় আরও শক্তিশালী করেছেন। ইরানি পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, মার্কিন বুট এই দ্বীপে পড়লে তার সেনারা ‘আগুনের বৃষ্টি’ বইয়ে দেবে। দ্বীপটিতে ইতিমধ্যে আধুনিক ভূমি থেকে আকাশে নিক্ষেপণযোগ্য মিসাইল ব্যাটারি মোতায়েন করা হয়েছে। পারস্য উপসাগরজুড়ে অসংখ্য গোপন ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র কেন্দ্র সক্রিয় রাখা হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবহরে বর্তমানে প্রায় পাঁচ হাজার নৌ-সেনা এবং ৮২তম এয়ারবোর্ন ডিভিশনের প্রায় দুই হাজার দক্ষ প্যারাট্রুপার রয়েছে। তাত্ত্বিকভাবে, রাতের অন্ধকারে মাত্র ২০ বর্গকিলোমিটারের এই ক্ষুদ্র দ্বীপটি দখল করা মার্কিন কমান্ডোদের জন্য কঠিন কিছু নয়। তবে আসল চ্যালেঞ্জ হলো এর পরের ধাপ: মার্কিন যুদ্ধজাহাজগুলোকে ইরান নিয়ন্ত্রিত সংকীর্ণ হরমুজ প্রণালী পার হতে হবে, যেখানে মাইন ও আত্মঘাতী ড্রোনের ঝুঁকি প্রবল।

দ্বীপ দখল করলেও মূল ভূখণ্ড থেকে ইরানের অবিরাম গোলাবর্ষণ ঠেকানো যুক্তরাষ্ট্রের জন্য প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়বে। এর আগে কৃষ্ণ সাগরে রাশিয়ার ‘স্নেক আইল্যান্ড’ দখলের পর যে পরিণতি হয়েছিল, খারগ দ্বীপেও তেমন হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

আমেরিকার অভ্যন্তরেও ট্রাম্পের অনেক সমর্থক এই যুদ্ধের বিরোধী। বিশেষ করে যারা যুদ্ধের অবসান ঘটানোর প্রতিশ্রুতিতে ট্রাম্পকে ভোট দিয়েছিলেন, তারা নতুন কোনো বিদেশি সংঘাতে জড়ানো পছন্দ করছেন না।

অনেকে মনে করছেন, খারগ দ্বীপ নিয়ে এই হম্বিতম্বি আসলে ট্রাম্পের একটি ‘স্ট্র্যাটেজিক ডিকয়’ বা ধোঁকাবাজি হতে পারে। মার্কিন প্রেসিডেন্টের আসল লক্ষ্য হতে পারে অন্য কোনো দ্বীপ, যেমন—লারাক দ্বীপ বা পারস্য উপসাগরের বৃহত্তম দ্বীপ কেশম। লারাক দ্বীপটি সরাসরি হরমুজ প্রণালীর প্রবেশপথে অবস্থিত হওয়ায় এর গুরুত্ব অপরিসীম।

যুদ্ধের দামামা বাজানোর পাশাপাশি ট্রাম্প জানিয়েছেন, ইরানের সাথে তার ‘গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা’ চলছে। যুদ্ধের পঞ্চম সপ্তাহে এসে ট্রাম্পের দ্বিমুখী আচরণ ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, তিনি সম্ভবত সামরিক অভিযানের চেয়ে একটি ‘বড় চুক্তি’ (The Deal) করতে বেশি মরিয়া। সম্ভবত সামরিক শক্তি প্রদর্শনের মাধ্যমে তিনি ইরানকে এমন এক অবস্থানে নিতে চাইছেন, যেখানে তেহরান নিঃশর্তভাবে ওয়াশিংটনের দাবিগুলো মেনে নেবে।

খারগ দ্বীপ শেষ পর্যন্ত কার দখলে থাকবে, তা এখন কেবল সমরশক্তির ওপর নয়, বরং কূটনীতির দাবার চালে নির্ধারিত হবে। তবে একটি ভুল পদক্ষেপ পুরো মধ্যপ্রাচ্যকে এক দীর্ঘস্থায়ী ও বিধ্বংসী আগুনের দিকে ঠেলে দিতে পারে।