রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর ইসলামাবাদে মুখোমুখি যুক্তরাষ্ট্র-ইরান: মারগালা পাহাড়ের পাদদেশে কি ফিরবে শান্তি?

0
রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর ইসলামাবাদে মুখোমুখি যুক্তরাষ্ট্র-ইরান: মারগালা পাহাড়ের পাদদেশে কি ফিরবে শান্তি?

আন্তর্জাতিক ডেস্কঃ ভয়াবহ সংঘাত, হাজারো প্রাণের বিয়োগান্তক মহাকাব্য আর বিশ্ব অর্থনীতিতে স্থবিরতার ছয় সপ্তাহ পর অবশেষে আলোচনার টেবিলে বসছে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান। পাকিস্তানের সবুজ ঘেরা রাজধানী ইসলামাবাদে আজ শনিবার থেকে শুরু হতে যাচ্ছে এই ঐতিহাসিক উচ্চপর্যায়ের কূটনৈতিক বৈঠক। একদিকে যুদ্ধের ক্ষত, অন্যদিকে গভীর অবিশ্বাস—এই দুই বৈরি আবহের মাঝেই বিশ্ব তাকিয়ে আছে ইসলামাবাদের দিকে।

ছয় সপ্তাহ আগে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সমন্বিত হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির মৃত্যুর পর মধ্যপ্রাচ্য এক ভয়াবহ অগ্নিকুণ্ডে পরিণত হয়। পাল্টা জবাবে ইরানও হামলা চালায়, যা কার্যত বিশ্বযুদ্ধের আবহ তৈরি করে। এই যুদ্ধের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ে জ্বালানি বাজারে। হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তেলের দাম রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছায়। বর্তমানে পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় দুই সপ্তাহের একটি ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি চলছে, যাকে ঘিরেই এই আলোচনার আয়োজন।

পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফের আমন্ত্রণে শনিবার সকালে ইসলামাবাদের অতি সুরক্ষিত ‘রেড জোন’ এলাকার সেরেনা হোটেলে এই আলোচনা শুরু হবে। সময়সীমা: ইরানের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের মতে, এই সংলাপ ১৫ দিন পর্যন্ত চলতে পারে।

নিরাপত্তা: বৈঠক উপলক্ষে ইসলামাবাদে ৯ ও ১০ এপ্রিল সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। শহরজুড়ে মোতায়েন করা হয়েছে নজিরবিহীন নিরাপত্তা বাহিনী।

এবারের বৈঠকের সবচেয়ে বড় চমক মার্কিন প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব। মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স নিজে উপস্থিত থাকছেন ইসলামাবাদে। তার সঙ্গে রয়েছেন ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ দূত স্টিভ উইটকফ ও জামাতা জ্যারেড কুশনার। গত ১৫ বছরের মধ্যে এটিই কোনো মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্টের প্রথম পাকিস্তান সফর।

অন্যদিকে, ইরানের পক্ষে নেতৃত্ব দেবেন পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাকের কালিবাফ এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি। যদিও আইআরজিসি-র সরাসরি উপস্থিতি নিয়ে ধোঁয়াশা রয়েছে, তবে সাবেক কমান্ডার কালিবাফের উপস্থিতি তেহরানের সামরিক ও রাজনৈতিক অবস্থানের প্রতিফলন হিসেবে দেখা হচ্ছে।

উভয় পক্ষই টেবিলে বিশাল দাবিনামা নিয়ে হাজির হয়েছে। ইরানের ১০ দফা: তেহরান চায় হরমুজ প্রণালির ওপর তাদের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা এবং মধ্যপ্রাচ্য থেকে পুরোপুরি মার্কিন সেনা প্রত্যাহার।

যুক্তরাষ্ট্রের শর্ত: ওয়াশিংটনের প্রধান লক্ষ্য ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম হস্তগত করা এবং পারমাণবিক কার্যক্রমের অবসান।

লেবানন সংকট: বর্তমানে আলোচনার সবচেয়ে বড় কাঁটা লেবানন। ইসরায়েল লেবাননে হামলা অব্যাহত রাখায় ইরান ক্ষুব্ধ। তেহরানের সাফ কথা—ইসরায়েল হামলা না থামালে তারা যুদ্ধবিরতি থেকে সরে আসবে। কিন্তু ওয়াশিংটন মনে করে, এই সমঝোতার সঙ্গে লেবানন ইস্যু যুক্ত নয়।

দীর্ঘদিন পর পাকিস্তান আন্তর্জাতিক কূটনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে। সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরের সক্রিয় যোগাযোগ এবং তেহরান-ওয়াশিংটন উভয়ের সঙ্গেই সুসম্পর্ক ইসলামাবাদকে একটি ‘নিরপেক্ষ ভূমি’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। বিশেষ করে ইরানে কোনো মার্কিন সামরিক ঘাঁটি না থাকা এবং পাকিস্তানে বিশাল শিয়া জনগোষ্ঠীর উপস্থিতি তেহরানের কাছে একে গ্রহণযোগ্য করে তুলেছে।

বিশ্লেষকরা এই বৈঠককে ‘কঠিন পথ’ হিসেবে দেখছেন। বিশ্লেষক মাসুদ খালিদ ও সাহার খানের মতে, সবচেয়ে বড় বাধা হলো পারস্পরিক অবিশ্বাস এবং ইসরায়েলের অনুপস্থিতি। ইসরায়েল লেবাননে হামলা চালিয়ে এই আলোচনাকে নস্যাৎ করতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

এই বৈঠকের ওপর নির্ভর করছে বিশ্ব জ্বালানি বাজারের স্থিতিশীলতা। যদি হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার বিষয়ে কোনো প্রাথমিক সমঝোতা হয়, তবে বিশ্ব অর্থনীতি হাফ ছেড়ে বাঁচবে। তবে আপাতত চূড়ান্ত কোনো শান্তিচুক্তি নয়, বরং আলোচনার মাধ্যমে ‘আস্থা তৈরি’ করাই এই বৈঠকের প্রাথমিক সাফল্য হবে বলে মনে করা হচ্ছে।

তথ্যসূত্র: আল জাজিরা ও আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা।