আন্তর্জাতিক ডেস্কঃ গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরান-ইসরাইল ও মার্কিন বাহিনীর মধ্যে শুরু হওয়া বিধ্বংসী সংঘাতের ৪০ দিন পেরিয়ে পরিস্থিতি এখন এক চরম অনিশ্চয়তার মুখে। যদিও বুধবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প অনির্দিষ্টকালের জন্য যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দিয়েছেন, তবে তেহরান একে ‘হামলার নতুন কৌশল’ হিসেবে দেখছে। একদিকে শান্তি আলোচনার টেবিলে বসার আহ্বান, অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্যে দানবীয় রণতরী ‘ইউএসএস জর্জ এইচ ডব্লিউ বুশ’ পাঠিয়ে সামরিক শক্তি বৃদ্ধি—ওয়াশিংটনের এই দ্বিচারিতায় মধ্যপ্রাচ্য এখন দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের প্রবেশদ্বারে দাঁড়িয়ে।
ফেব্রুয়ারির সেই আকস্মিক হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিসহ শীর্ষ কর্মকর্তাদের হারিয়ে তেহরান নেতৃত্বশূন্য হবে বলে ওয়াশিংটন ও তেল আবিব যে ধারণা করেছিল, তা ভুল প্রমাণিত হয়েছে। ইরান কেবল পাল্টা আঘাতই হানেনি, বরং মার্কিন ঘাঁটি ও তেল আবিবে ক্ষেপণাস্ত্র বৃষ্টির মাধ্যমে নিজের সামরিক সক্ষমতার জানান দিয়েছে। সবচেয়ে বড় আঘাতটি এসেছে হরমুজ প্রণালি বন্ধের মাধ্যমে, যা বিশ্ব অর্থনীতিকে খাদের কিনারায় ঠেলে দিয়েছে।
হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল বন্ধ হওয়ায় বিশ্বজুড়ে দেখা দিয়েছে নজিরবিহীন জ্বালানি সংকট। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার (আইইএ) প্রধান ফাতিহ বিরোল সতর্কবার্তা দিয়ে বলেছেন “বিশ্ব বর্তমানে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় জ্বালানি নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখোমুখি।”
যুদ্ধবিরতির মেয়াদেও ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে উত্তেজনার মূল কেন্দ্রবিন্দু এখন ‘নৌ-অবরোধ’। ট্রাম্প প্রশাসন ইরানের নৌ-বন্দরগুলোতে কঠোর অবরোধ বহাল রেখেছে। তাদের বিশ্বাস, অর্থনৈতিকভাবে পঙ্গু করে দিলে ইরান নতি স্বীকার করতে বাধ্য হবে।
তেহরান এই অবরোধকে সরাসরি ‘যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন’ হিসেবে অভিহিত করেছে। এর জবাবে তারা হরমুজ প্রণালিতে নিজেদের আধিপত্য আরও কঠোর করেছে, যা বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহ প্রায় স্তব্ধ করে দিয়েছে।
ইসলামাবাদ দুই দেশের মধ্যে দ্বিতীয় দফার শান্তি আলোচনার জন্য জোর তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র এতে রাজি হওয়ার সংকেত দিলেও ইরান সাফ জানিয়ে দিয়েছে—নৌ-অবরোধ তুলে না নেওয়া পর্যন্ত তারা আলোচনার টেবিলে ফিরবে না। ইরানি নেতাদের সাফ কথা, মার্কিন ‘উচ্চাকাঙ্ক্ষী দাবি’ মেনে নিয়ে তারা আত্মসমর্পণ করবেন না।
সিএনএন-এর তথ্যমতে, মার্কিন বিমানবাহী রণতরী ‘ইউএসএস জর্জ এইচ ডব্লিউ বুশ’ মধ্যপ্রাচ্যের দিকে এগিয়ে আসছে। এর অর্থ হলো যেকোনো সময় যুদ্ধবিরতি ভেঙে গেলে কয়েক ডজন যুদ্ধবিমান নিয়ে ইরানকে ঘিরে ধরবে মার্কিন নৌবাহিনী। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, দুই পক্ষই নিজেদের অবস্থান থেকে এক চুলও নড়তে নারাজ।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসির মতে, পশ্চিমাদের চাপ সহ্য করার ক্ষমতা ইরানের ‘ডিএনএ’-তে মিশে আছে। ফলে অর্থনৈতিক ক্ষয়ক্ষতি হলেও তেহরান শর্তহীন কোনো চুক্তিতে যাবে না। এতে করে মধ্যপ্রাচ্যে একটি দীর্ঘমেয়াদী সংঘাতের আশঙ্কা ক্রমেই ঘনীভূত হচ্ছে, যা কেবল আঞ্চলিক নয়, বরং বিশ্ব অর্থনীতি ও ভূ-রাজনীতিকে আমূল বদলে দিতে পারে।

