আন্তর্জাতিক ডেস্কঃ কথিত ‘বাংলাদেশি ও রোহিঙ্গা’ অনুপ্রবেশকারীদের চিহ্নিত করে আটকে রাখার জন্য পশ্চিমবঙ্গের প্রতিটি জেলায় ‘হোল্ডিং সেন্টার’ বা অস্থায়ী আটক শিবির তৈরির নির্দেশ দিয়েছে রাজ্য সরকার। ভারতের অন্যান্য রাজ্যে গত এক বছরে এ ধরনের হোল্ডিং সেন্টার গড়ে তোলা হলেও, পশ্চিমবঙ্গে এই প্রথম এমন বিতর্কিত ও নজিরবিহীন উদ্যোগ নেওয়া হলো।
একই সঙ্গে, জেল থেকে সাজার মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও যে সমস্ত বিদেশি নাগরিকরা নিজ দেশে প্রত্যর্পিত হওয়ার অপেক্ষায় রয়েছেন, তাদেরও আর সাধারণ কারাগারে না রেখে এই হোল্ডিং সেন্টারগুলোতে স্থানান্তরিত করা হবে।
গত সপ্তাহের শেষভাগে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য পুলিশের কাছে পাঠানো একটি বিশেষ সরকারি নোটে এই নির্দেশ জারি করা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, ‘বেআইনিভাবে দেশে বসবাসরত বাংলাদেশি ও রোহিঙ্গাদের প্রত্যর্পণ’ পদ্ধতি সংক্রান্ত যে কড়া নির্দেশিকা গত বছর কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জারি করেছিল, তা অক্ষরে অক্ষরে মেনে প্রতিটা জেলায় এই হোল্ডিং সেন্টারগুলো গড়ে তুলতে হবে।
কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এই রূপরেখা মেনে ইতিপূর্বে গুজরাত, মহারাষ্ট্র, হরিয়ানা, দিল্লি ও ওড়িশার মতো ভারতের একাধিক রাজ্যে ইতিমধ্যেই বহু মানুষকে আটক করে এই ধরণের শিবিরে রাখা হয়েছে। তবে উদ্বেগের বিষয় হলো, অনুপ্রবেশকারী সন্দেহে আটক হওয়া এই ব্যক্তিদের মধ্যে একটা বড় অংশই ছিলেন পশ্চিমবঙ্গের বাসিন্দা তথা প্রকৃত ভারতীয় নাগরিক, যারা মূলত জীবিকার তাগিদে ভিন রাজ্যে পাড়ি দেওয়া বাংলাভাষী মুসলমান পরিযায়ী শ্রমিক।
এই সাঁড়াশি অভিযানের সূত্রপাত মূলত গত বছরের একটি সহিংস ঘটনাকে কেন্দ্র করে। ২২শে এপ্রিল ভারত শাসিত কাশ্মীরের পহেলগামে বন্দুকধারীদের গুলিতে ২৬ জন বেসামরিক মানুষ নিহত হওয়ার পর ভারতের একাধিক রাজ্যে কথিত বাংলাদেশি ও রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশকারীদের খোঁজে ব্যাপক তল্লাশি শুরু হয়।
এই অভিযানে নারী ও শিশুসহ হাজার হাজার মানুষকে সন্দেহভাজন হিসেবে আটক করা হয়। পরিচয় যাচাইয়ের নামে তাদের দিনভর, এমনকি সপ্তাহ খানেক বা তারও বেশি সময় আটকে রাখা হয়। পরবর্তীতে অনেককে ছেড়ে দেওয়া হলেও, বেশ কিছু পরিবারকে আইনি প্রক্রিয়া ছাড়াই বাংলাদেশে জোরপূর্বক পুশ-আউট বা ঠেলে দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
বিবিসি বাংলার অনুসন্ধান এবং মুক্তিপ্রাপ্ত ভুক্তভোগীদের জবানবন্দি অনুযায়ী, হোল্ডিং সেন্টারগুলো দৃশ্যত কোনো প্রথাগত জেলখানা নয়। অস্থায়ীভাবে কোনো বড় অনুষ্ঠানবাড়ি বা পরিত্যক্ত সরকারি দফতরকে কাঁটাতার ও কড়া পুলিশি পাহারায় মুড়ে এই শিবিরগুলো তৈরি করা হয়েছে।
আটক হওয়া নাগরিকদের অভিজ্ঞতা থেকে জানা যায় কিছু চাঞ্চল্যকর তথ্য, ভিন রাজ্যে কেবল ‘বাংলা ভাষায়’ কথা বলা এবং ধর্মীয় পোশাক বা নামের কারণেই ঢালাওভাবে পরিযায়ী শ্রমিকদের সন্দেহভাজন হিসেবে ধরে আনা হতো। হোল্ডিং সেন্টারে ঢোকানোর পরপরই তাদের মোবাইল ফোন কেড়ে নেওয়া হতো, যাতে তারা পরিবারের সাথে যোগাযোগ করতে না পারেন। ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত মানুষকে একসঙ্গে আটকে রাখা এবং অপর্যাপ্ত ও নিম্নমানের খাবার দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
“অনুপ্রবেশকারী সন্দেহে বহু ভারতীয় বাংলাভাষী মুসলমান পরিযায়ী শ্রমিক ও শিশুকে আটক রাখা হয়েছিল। সেখানে ভয়াবহ হেনস্তা, নির্যাতন এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটেছে। অথচ পরে প্রমাণিত হয়েছে যে তারা এ দেশেরই বৈধ নাগরিক।” -আসিফ ফারুক, রাজ্য সাধারণ সম্পাদক, পরিযায়ী শ্রমিক মঞ্চ
ভারতের প্রচলিত আইন অনুযায়ী, কোনো বিদেশি নাগরিক অবৈধভাবে অনুপ্রবেশ করলে ‘ফরেনার্স অ্যাক্ট’ বা বিদেশি আইনে তার বিচার হবে। আদালত দোষী সাব্যস্ত করলে সাজা খাটার জন্য তাকে কারাগারে রাখা হবে এবং সাজা শেষে সংশ্লিষ্ট দেশের দূতাবাসের মাধ্যমে পরিচয় নিশ্চিত করে তবেই প্রত্যর্পণ (ডিপোর্ট) করা হবে।
কিন্তু নতুন কেন্দ্রীয় নির্দেশিকায় আইনি প্রক্রিয়াকে পাশ কাটিয়ে এক প্রশাসনিক জটিলতা তৈরি করা হয়েছে অনুপ্রবেশকারী চিহ্নিতকরণ ও দ্রুত প্রত্যর্পণের জন্য প্রতিটি রাজ্যকে বিশেষ টাস্ক ফোর্স গঠন করতে হবে। সন্দেহভাজন ব্যক্তি যে রাজ্যের বাসিন্দা বলে দাবি করবেন, সেই রাজ্যের পুলিশকে ৩০ দিনের মধ্যে পরিচয় যাচাই করে রিপোর্ট পাঠাতে হবে। যদি ৩০ দিনের মধ্যে রিপোর্ট না আসে, তবে ফরেনার্স রিজিওনাল রেজিস্ট্রেশন অফিসার (FRRO) সরাসরি তাকে প্রত্যর্পণের ব্যবস্থা নেবেন।
এই ত্রুটিপূর্ণ ব্যবস্থার কারণে পশ্চিমবঙ্গের বাসিন্দা সোনালী খাতুন (যিনি গর্ভবতী ছিলেন), মুর্শিদাবাদের মেহবুব শেখ এবং পূর্ব বর্ধমানের মুস্তাফা কামাল শেখের মতো প্রকৃত ভারতীয় নাগরিকদের বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়া হয়েছিল। পরবর্তীতে ভুল বুঝতে পেরে ভারত সরকার অবশ্য তাদের ফিরিয়ে আনতে বাধ্য হয়।
পশ্চিমবঙ্গে এই হোল্ডিং সেন্টার গড়ার পেছনে রাজনৈতিক সমীকরণ রয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পর শুভেন্দু অধিকারী ঘোষণা করেছিলেন যে, রাজ্যে কথিত অনুপ্রবেশকারীদের ‘ডিটেক্ট, ডিলিট ও ডিপোর্ট’ (চিহ্নিতকরণ, বাদ দেওয়া ও বিতাড়ন) করা হবে। রাজ্য স্বরাষ্ট্র দফতরের এই নতুন নির্দেশিকাকে সেই ঘোষণারই বাস্তবায়ন হিসেবে দেখা হচ্ছে।
তবে এই সিদ্ধান্তের তীব্র বিরোধিতা করে জাতীয় কংগ্রেসের নেতা ও প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ প্রসেনজিৎ বসু প্রশ্ন তুলেছেন রাজ্য ও কেন্দ্রের স্বচ্ছতা নিয়ে। তিনি জানান, তথ্যের অধিকার আইনে (RTI) ২০০০ সাল থেকে গত বছর পর্যন্ত কতজন অনুপ্রবেশকারী ধরা পড়েছে, তাদের ধর্মীয় পরিচয় কী, কিংবা কতজনকে পুশ-ব্যাক করা হয়েছে—এই সংক্রান্ত কোনো প্রশ্নের উত্তর দিতে পারেনি ভারতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
তার সাফ বক্তব্য, রাজ্যে কতজন প্রকৃত অনুপ্রবেশকারী বা রোহিঙ্গা আছে, সেই সঠিক পরিসংখ্যান না দিয়ে তড়িঘড়ি করে এই ধরণের ‘ডিটেনশন ক্যাম্প’ বা আটক শিবির তৈরি করার উদ্দেশ্য গভীর রহস্য ও আতঙ্কের জন্ম দেয়।
সূত্রঃ বিবিসি বাংলা

