তিব্বত-নেপাল সীমান্তে ভয়াবহ বন্যায় নিহত দেড়শ ছাড়াল, নিখোঁজ সাড়ে চার শতাধিক

0
তিব্বত-নেপাল সীমান্তে ভয়াবহ বন্যায় নিহত দেড়শ ছাড়াল, নিখোঁজ সাড়ে চার শতাধিক

আন্তর্জাতিক ডেস্কঃ পূর্বাভাসহীন ও বিনা মেঘে বজ্রপাতের মতো নেমে আসা ভয়াবহ প্রলয়ঙ্করী বন্যায় তছনছ হয়ে গেছে হিমালয়কন্যা নেপালের বিস্তীর্ণ অঞ্চল। নেপাল-চীন (তিব্বত) সীমান্তে ভোটকোশী ও লহেন্দে নদী অববাহিকায় আকস্মিক এই জলপ্রলয়ে নিহতের সংখ্যা ১৫৭ ছাড়িয়েছে। এখনো নিখোঁজ রয়েছেন বিভিন্ন দেশের পর্যটক ও স্থানীয় নিরাপত্তাকর্মীসহ চার শতাধিক মানুষ।

নেপালের পুলিশ হেডকোয়ার্টার্স ও শীর্ষ স্থানীয় গণমাধ্যম ‘দ্য কাঠমান্ডু পোস্ট’-এর তথ্য অনুযায়ী, এটি ১৯৯৩ সালের পর হিমালয় রাষ্ট্রটিতে ঘটে যাওয়া সবচেয়ে ভয়াবহ ও প্রাণঘাতী প্রাকৃতিক বিপর্যয়।

বুধবার (২৬ আগস্ট) সকালের দিকে নেপাল-চীন সীমান্তের রাসুওয়া জেলার রাসুওয়াগাধি এলাকায় আকস্মিক এ বিপর্যয় শুরু হয়। স্যাটেলাইট চিত্র বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা জানান, চীন-তিব্বত সীমানায় ভূপৃষ্ঠ থেকে ৪.৪ মাত্রার মৃদু ভূকম্পনের প্রভাবে এক বিশাল হিমবাহ ও তুষারধস (Ice Avalanche) নেমে আসে। ওই বরফ ও পাথরের স্তূপ লহেন্দে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ সাময়িকভাবে আটকে দিয়ে কৃত্রিম হ্রদের সৃষ্টি করে। কিছুক্ষণ পর তীব্র চাপে সেই বরফের বাঁধ ভেঙে কোটি কোটি কুইসেক পানি ও কাদা একযোগে নিম্নাঞ্চলের দিকে ধেয়ে আসে।

সবচেয়ে মর্মান্তিক বিষয় হলো, ওই এলাকায় কোনো বৃষ্টিপাত না থাকায় বাসিন্দাদের কোনো আগাম পূর্বাভাস বা সতর্কবার্তা দেওয়া সম্ভব হয়নি। রাসুওয়ার প্রধান কাস্টমস কর্মকর্তা রাজেন্দ্র ধুঙ্গানা জানান, প্রথমে ভূকম্পন মনে হলেও বাইরে এসে দেখা যায় ধোঁয়ার মতো কুয়াশা ও পানির বিশাল ঢেউ পুরো তিমিউরে ও সিয়াপ্রুবেশি বাজার এলাকা নিমিষেই গ্রাস করে নেয়। রাসুওয়াগাধি সীমান্তে রাখা ৩০০টিরও বেশি পণ্যবাহী ও যাত্রীবাহী ট্রাক পানির স্রোতে তাসের ঘরের মতো ভেসে যায়।

নেপাল পুলিশের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, রাতে সাড়ে ৮টা পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত জেলাগুলো থেকে অন্তত ১৫৭টি লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। এর মধ্যে চিতওয়ান ৩৩ জন, গোর্খা ১৯ জন, ধাদিং ১৮ জন, নুয়াকোট ১১ জন, নওয়ালপুর ১১ জন, তানাহু ৭ জন, রাসুওয়া ও অন্যান্য এলাকা ৫৭+ জন

এছাড়া নিখোঁজ রয়েছেন ৪০৩ জন পর্যটক ও স্থানীয় অধিবাসী। নিখোঁজদের মধ্যে ৩৪১ জনই বিদেশি নাগরিক, যা ২৬টি ভিন্ন দেশের প্রতিনিধি। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত ভারতীয় তীর্থযাত্রী (১৩৩ জন), মার্কিন নাগরিক (৪৭ জন) এবং ব্রিটিশ নাগরিক (৩৩ জন)। পাশাপাশি কর্তব্যরত অবস্থায় নিখোঁজ হয়েছেন নেপালের সশস্ত্র পুলিশ ও সেনাবাহিনীর অন্তত ৪৪ জন সদস্য।

দুর্যোগে নেপালের ৯টি প্রধান জলবিদ্যুৎ প্রকল্প ধ্বংস বা মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় দেশটির একটি বিশাল অংশ বিদ্যুৎহীন হয়ে পড়েছে। অন্তত ১৯টি গুরুত্বপূর্ণ ঝুলন্ত ও কংক্রিট সেতু এবং প্রায় ৪০ কিলোমিটার মহাসড়ক সম্পূর্ণরূপে পানির তোড়ে বিলীন হয়ে গেছে। ধ্বংস হয়েছে ৯টি ব্যাংকের আঞ্চলিক শাখা।

নুওয়াকোটের বিদুর পৌরসভার প্রতিনিধিরা জানান, কয়েকশ ঘরবাড়ি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। সেতু ধ্বংস হওয়ায় হাজার হাজার মানুষ অবরুদ্ধ অবস্থায় জীবন কাটাচ্ছেন।

দুর্যোগের ভয়াবহতা দেখে চীন ও নেপালের আবহাওয়া প্রশাসন এবং সীমান্ত কর্তৃপক্ষ দ্রুত এক ভার্চুয়াল জরুরি বৈঠকে মিলিত হয়। সীমান্তে পানি বাড়লে সঙ্গে সঙ্গে আগাম তথ্য সরবরাহ করার আশ্বাস দিয়েছে বেইজিং।

এদিকে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নেপালের প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহের কাছে গভীর শোক প্রকাশ করে জরুরি ত্রাণ ও চিকিৎসা সহায়তার পূর্ণ অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছেন। নেপাল সরকার দেশটিতে উদ্ধারকাজ ত্বরান্বিত করতে সেনাবাহিনী ও জাতীয় দুর্যোগ সংস্থাকে পূর্ণ মাত্রায় মোতায়েন করেছে।