আন্তর্জাতিক ডেক্স: হিমালয় পর্বতমালায় আকস্মিক হিমবাহ (গ্লেসিয়ার) ধসে সৃষ্ট ভয়াবহ বন্যা ও প্রলয়ঙ্করী কাদাধসে হিমালয়কন্যা নেপাল ও স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল তিব্বতে চরম মানবিক বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। গত বুধবার নেপাল-তিব্বত সীমান্তে ঘটা এই প্রাকৃতিক দুর্যোগে নেপালেই প্রাণহানির সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫৪৭ জনে এবং তিব্বতে ৫ জনসহ মোট মৃতের সংখ্যা ৫৫২ ছাড়িয়েছে।
ভয়াবহ এ দুর্ঘটনায় উভয় দেশে আহত হয়েছেন ১,৪৭৩ জনেরও বেশি। এখনো দুই দেশ মিলিয়ে প্রায় দেড় হাজারের বেশি মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন, যার মধ্যে বিশাল একটি অংশ আন্তর্জাতিক পর্যটক। আজ শুক্রবার (২৮ আগস্ট) বিকেলে নেপাল পুলিশ ও চীনের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম এ তথ্য নিশ্চিত করেছে।
নেপালের জাতীয় দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ (এনডিআরআরএমএ) এবং পুলিশ সদর দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, দুর্যোগকবলিত এলাকাগুলোতে এখনো ৯৭৭ জন নিখোঁজ রয়েছেন। নিখোঁজদের মধ্যে ৫১৭ জনই বিভিন্ন দেশের বিদেশি পর্যটক ও পর্বতারোহী। নেপাল পর্যটন বোর্ড জানিয়েছে, প্রতিকূল আবহাওয়ার মধ্যেও এখন পর্যন্ত চরম ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা থেকে ১২১ জন বিদেশিকে জীবিত উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে।
কাঠমান্ডুতে নেপাল সরকারের প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর থেকে জানানো হয়েছে, পরিস্থিতি সামাল দিতে উদ্ধারকাজে নতুন করে আরও ১,২০০ সেনা সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। বর্তমানে নেপাল পুলিশের ৪,৪৭৩ জনের একটি বিশাল উদ্ধারকারী দল সশস্ত্র বাহিনীর সাথে সমন্বয় করে রাতদিন উদ্ধার অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে।
বার্তা সংস্থা এএফপি ও চীনের সরকারি সংবাদ সংস্থা সিনহুয়া জানিয়েছে, হিমবাহ ধসে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তিব্বতের আন্তর্জাতিক সীমান্ত বাণিজ্য কেন্দ্র ‘গিরং’ (Gyirong)। প্রলয়ঙ্করী কাদাধসে পুরো বাণিজ্য শহরটি মাটির নিচে তলিয়ে যাওয়ার দুই দিন পর আজ বিকেলে ২১ সদস্যের বিশেষ চীনা উদ্ধারকারী দল প্রথমবারের মতো দুর্ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে সক্ষম হয়েছে।
তিব্বতে বর্তমানে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৫ জনে দাঁড়িয়েছে এবং এখনও ৫৫৮ জন নিখোঁজ রয়েছেন। পরিস্থিতি পর্যালোচনায় চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং বেইজিংয়ে উচ্চপর্যায়ের জরুরি বৈঠক করেছেন।
কাদাধসের ফলে নদীর গতিপথ রুদ্ধ হয়ে উজানে যে বিশালাকার বিপজ্জনক কৃত্রিম হ্রদের সৃষ্টি হয়েছিল, তার পানি উপচে পড়ার আশঙ্কায় উদ্ধারকাজ সাময়িকভাবে স্থগিত করা হলেও বর্তমানে সেই ঝুঁকি অনেকটাই প্রশমিত হয়েছে। রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, হ্রদের পানির চাপ কমায় এখন সুশৃঙ্খলভাবে ধ্বংসস্তূপ সরানোর কাজ চলছে।
ভূ-বিজ্ঞানী ও ভৌগোলিক কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে সিনহুয়া সতর্ক করে জানিয়েছে, সংলগ্ন পার্বত্য অঞ্চলে অতিরিক্ত বরফাবৃত হ্রদ (Glacial Lakes) এবং সম্ভাব্য ভূমিধসের মতো একাধিক সুপ্ত ও অদৃশ্য ঝুঁকি এখনো রয়ে গেছে। অতিরিক্ত ঠান্ডা, বিষাক্ত কাদা এবং নতুন করে ধসের আশঙ্কায় উদ্ধারকর্মীরা চরম প্রতিকূলতার মুখোমুখি হচ্ছেন।
প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি নেপাল ও তিব্বত সীমান্ত অঞ্চলে এই শতাব্দীর অন্যতম ভয়াবহ এ ট্র্যাজেডিতে বিশ্বজুড়ে গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে। উদ্ধার তৎপরতা ত্বরান্বিত করতে আন্তর্জাতিক সহায়তার আহ্বান জানিয়েছে ক্ষতিগ্রস্ত অঞ্চলের প্রশাসন।

