ফিরতি জনস্রোতে বাস-ট্রেনে তিল ধারণের ঠাঁই নেই, লঞ্চঘাটে যাত্রীদের উপচে পড়া ভিড়

0
ফিরতি জনস্রোতে বাস-ট্রেনে তিল ধারণের ঠাঁই নেই, লঞ্চঘাটে যাত্রীদের উপচে পড়া ভিড়

বাংলাদেশ প্রতিবেদকঃ পবিত্র ঈদুল ফিতরের দীর্ঘ ছুটি শেষে যান্ত্রিক নগরী ঢাকা তার চিরচেনা রূপে ফিরতে শুরু করেছে। নাড়ির টান ছিঁড়ে নাড়াচাড়া দিয়ে উঠেছে কর্মব্যস্ততা। আজ এবং আগামীকাল থেকে দেশের বন্ধ থাকা শিল্প-কারখানা ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো পুরোদমে সচল হচ্ছে। ফলে শুক্রবার থেকেই রাজধানীমুখী মানুষের জোয়ার আছড়ে পড়ছে রেল, সড়ক ও নৌপথে।

নদীমাতৃক বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চল—বরিশাল, ভোলা, পটুয়াখালী, বরগুনা ও ঝালকাঠি থেকে আসা যাত্রীদের প্রধান ভরসা নৌপথ। আজ ভোর থেকেই সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনালে দেখা গেছে মানুষের উপচে পড়া ভিড়। প্রতিটি বিশালকায় লঞ্চ কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে ঘাটে ভিড়ছে। কেবিন তো দূরের কথা, ডেক বা বারান্দাতেও বসার জায়গা পাননি অনেক যাত্রী।

বরিশাল থেকে আসা ব্যাংক কর্মকর্তা শরিফুল ইসলাম জানান, “পরিবারের সাথে ঈদ কাটিয়ে ফিরছি। লঞ্চে তিল ধারণের জায়গা নেই, অনেকটা যুদ্ধ করেই ঢাকা পৌঁছাতে হয়েছে।” সদরঘাট এলাকায় কুলিদের ব্যস্ততা এবং শত শত মানুষের ব্যাগ-পোটলা নিয়ে গন্তব্যে ছোটার দৃশ্য বলে দিচ্ছিল—ঢাকা আবার তার পুরনো প্রাণ ফিরে পেয়েছে।

রেলপথের চিত্র ছিল আরও ভয়াবহ। জারিয়া-ঝাঞ্জাইল, মোহনগঞ্জ ও কিশোরগঞ্জ থেকে ময়মনসিংহ হয়ে ঢাকাগামী প্রতিটি ট্রেনেই ছিল যাত্রীদের প্রাণান্তকর চেষ্টা। ট্রেনের ভেতরে জায়গা না পেয়ে অসংখ্য মানুষকে বগির সংযোগস্থলে, ইঞ্জিনে এবং জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ছাদ ভ্রমণ করতে দেখা গেছে।

শ্রীপুর রেলওয়ে স্টেশনের মাস্টার শামীমা জাহান জানান, শুক্রবার থেকেই যাত্রীদের এই প্রবল চাপ শুরু হয়েছে। মূলত যানজট এড়াতে এবং নির্ধারিত সময়ে পৌঁছাতে যাত্রীরা ট্রেনের ওপর বেশি নির্ভর করছেন। ভিড়ের কারণে অনেক নারী ও শিশু স্টেশনে দাঁড়িয়ে থেকেও ট্রেনে উঠতে পারেননি।

গাবতলী ও মহাখালী বাস টার্মিনালগুলো ঘুরে দেখা গেছে, দূরপাল্লার বাসগুলো একের পর এক যাত্রী নিয়ে ফিরছে। আগামীকাল রবিবার থেকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার বাধ্যবাধকতা থাকায় সপরিবারে ফেরার হার বেশি। তবে এবার ২৬ থেকে ২৮ মার্চ পুনরায় টানা ছুটি থাকায় মানুষ ধাপে ধাপে ফিরছে, যা বড় ধরনের মহাসড়ক বিপর্যয় রুখে দিয়েছে।

মাগুরা থেকে আসা যাত্রী আলাল উদ্দিন আক্ষেপ করে জানান, সরাসরি টিকিট না পেয়ে ভেঙে ভেঙে নদী পার হয়ে তাকে ঢাকা আসতে হয়েছে এবং পথে বাড়তি ভাড়ার শিকার হয়েছেন। তবে নোয়াখালী থেকে আসা আজিজুল ইসলামের মতে, পথে ধীরগতি থাকলেও বড় কোনো দুর্ঘটনা বা ভোগান্তি ছাড়াই তিনি কর্মস্থলে পৌঁছাতে পেরেছেন।

দীর্ঘ কয়েকদিনের নিস্তব্ধতা কাটিয়ে মহাখালী ও গাবতলী আন্তঃজেলা বাস টার্মিনালগুলো আবার মুখর হয়ে উঠেছে। উত্তরবঙ্গ ও ময়মনসিংহ অঞ্চল থেকে আসা যাত্রীদের হাতে ছিল গ্রাম থেকে আনা পিঠা-পুলি ও প্রয়োজনীয় সামগ্রীর ব্যাগ। পরিবহন শ্রমিকদের চোখে-মুখেও ছিল কর্মব্যস্ততার ছাপ। ডিলাক্স পরিবহনের একজন হেলপার জানান, কোনো গাড়িই খালি আসছে না এবং আগামী কয়েকদিন এই চাপ অব্যাহত থাকবে।

পরিবারের সাথে ঈদের নির্মল আনন্দ ভাগাভাগি শেষে কর্মস্থলে ফেরার এই সংগ্রাম যেন বাঙালির চিরকালীন সংস্কৃতির অংশ। প্রিয়জনদের ছেড়ে আসার বিষণ্ণতা থাকলেও নিরাপদে কর্মস্থলে পৌঁছাতে পেরে স্বস্তি প্রকাশ করেছেন অধিকাংশ যাত্রী। আগামী কয়েক দিনে রাজধানী তার পূর্ণ কর্মচাঞ্চল্য ফিরে পাবে বলে আশা করা হচ্ছে।