আন্তর্জাতিক ডেস্কঃ যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ার সান ডিয়েগো শহরের প্রধান মসজিদে বন্দুকধারীদের হামলায় নিহত তিন মুসলিম হিরোর বিদায় জানাল হাজারো মানুষ। গতকাল বৃহস্পতিবার শহরের একটি স্থানীয় পার্কে তাদের আবেগঘন জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। শোকাবহ এই বিদায় অনুষ্ঠানে অংশ নেন ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে দুই হাজারেরও বেশি শোকার্ত মানুষ। কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরার এক প্রতিবেদন থেকে এ তথ্য জানা গেছে।
জানাজায় সাধারণ মুসলিমদের পাশাপাশি নিহতদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে ইউনিফর্ম পরিহিত শত শত পুলিশ কর্মকর্তাও অংশ নেন। পার্কের একটি সাদা ছাউনির নিচে শুভ্র কাপড়ে মোড়ানো তিন বীরের মরদেহ সারিবদ্ধভাবে রাখা হলে সেখানে এক হৃদয়বিদারক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। এ সময় সমবেত জনতা উচ্চকণ্ঠে ‘আল্লাহু আকবার’ (আল্লাহ মহান) ধ্বনি দিয়ে নিহতদের রুহের মাগফিরাত কামনা করেন।
নিহতরা হলেন—১. আমিন আবদুল্লাহ (৫১), ২. মানসুর কাজিহা (৭৮) এবং ৩. নাদির আওয়াদ (৫৭)। জানাজা শেষে স্থানীয় একটি কবরস্থানে এই তিনজনকে পাশাপাশি সমাহিত করা হয়।
জানাজা শেষে স্থানীয় ইসলামিক সেন্টারের ইমাম তাহা হাসান এক আবেগঘন বক্তব্য দেন। তিনি বলেন “আজকের এই বিশাল সমাবেশ বিশ্বকে একটি স্পষ্ট বার্তা দিচ্ছে—আমাদের সম্প্রদায় গভীরভাবে আঘাত পেয়েছে সত্য, কিন্তু আমরা ভেঙে পড়িনি; আমরা এখনো দৃঢ় ও ঐক্যবদ্ধ।”
তিনি আরও জানান, নিহতদের প্রতি ভালোবাসা জানাতে এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের পাশে দাঁড়াতে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন অঙ্গরাজ্য থেকে বহু মানুষ বিমানে চড়ে সান ডিয়েগোতে ছুটে এসেছেন।
গত সোমবার সান ডিয়েগোর বৃহত্তম মসজিদ ‘ইসলামিক সেন্টার অব সান ডিয়েগো’-তে দুই কিশোর বন্দুকধারী অতর্কিত হামলা চালায়। প্রত্যক্ষদর্শী ও পুলিশ জানায়, চরম সাহসিকতার সঙ্গে বন্দুকধারীদের প্রতিহত করতে গিয়েই এই তিন ব্যক্তি প্রাণ হারান।
হামলা শুরু হওয়া মাত্রই তিনি নিজের জীবনের পরোয়া না করে আততায়ীদের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে জড়িয়ে পড়েন। একই সঙ্গে তিনি ওয়্যারলেসের (রেডিও) মাধ্যমে দ্রুত পুরো মসজিদ লকডাউন বা অবরুদ্ধ করার নির্দেশ দেন।
মসজিদের ভেতরেই একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় সচল ছিল, যেখানে ঘটনার সময় ১৪০ জন কোমলমতি শিশু পড়াশোনা করছিল। আমিন আবদুল্লাহর তাৎক্ষণিক লকডাউনের নির্দেশের ফলেই শিক্ষক ও শিশুরা নিরাপদে শ্রেণিকক্ষ ও আলমারির ভেতরে লুকিয়ে জীবন বাঁচাতে সক্ষম হয়।
গুলির শব্দ শুনে মসজিদের কর্মী মানসুর কাজিহা এবং আরেক বীর নাদির আওয়াদ (যার স্ত্রী ওই স্কুলেরই শিক্ষিকা) সাহায্যের জন্য অকুস্থলে ছুটে আসেন। হামলাকারীদের রুখে দেওয়ার চেষ্টাকালে তিনজনই গুরুতর গুলিবিদ্ধ হন এবং পরে মারা যান।
পুলিশ জানিয়েছে, হামলাকারী দুই কিশোর পরে একটি গাড়িতে করে পালিয়ে যায়। তবে পরবর্তী সময়ে তাদেরও মৃত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়।
সান ডিয়েগোর পুলিশ প্রধান স্কট ওয়াহল জানিয়েছেন, এই পৈশাচিক ঘটনাটিকে ‘হেট ক্রাইম’ বা ঘৃণাজনিত অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করছে পুলিশ।
এদিকে, এই বর্বরোচিত হামলার পর পুরো যুক্তরাষ্ট্রের মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে গভীর উদ্বেগ ও নিরাপত্তাহীনতা ছড়িয়ে পড়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে দেশটিতে ইসলামবিদ্বেষ (ইসলামোফোবিয়া) আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পাওয়ার প্রেক্ষাপটে এই হামলাকে অত্যন্ত উদ্বেগজনক এবং পরিকল্পিত বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

