সাহারুল হক সাচ্চুঃ আধুনিকতার ছোঁয়ায় যেখানে গ্রামীণ সমাজব্যবস্থাতেও ভাঙন ধরছে, সেখানে যুগ যুগ ধরে সম্প্রীতির এক অনন্য দৃষ্টান্ত ধরে রেখেছে সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়া উপজেলার বামন ঘিয়ালা গ্রাম। উপজেলার পূর্ণিমাগাতী ইউনিয়নের এই গ্রামটিতে কোনো দল-উপদল নেই; পুরো গ্রামের ৩৬২টি পরিবার মিলেমিশে বাস করছে একটি মাত্র সামাজিক গণ্ডিতে। আদি কাল থেকে চলে আসা এই ‘এক গ্রাম, এক সমাজ’ নীতি আজো অক্ষুণ্ন রয়েছে।
বামন ঘিয়ালা গ্রামের এই অটুট বন্ধন সবচেয়ে চমৎকারভাবে ফুটে ওঠে পবিত্র ঈদুল আজহায়। গ্রামের অধিকাংশ মানুষই পেশায় কৃষক। কোরবানি ঈদে এখানে দেখা যায় ত্যাগের এক পাক্ষিক মহোৎসব। ঈদের নামাজের পর পুরো গ্রামের সব কোরবানি পশু নির্দিষ্ট একটি মাঠে জড়ো করা হয়। এরপর সবার সম্মিলিত অংশগ্রহণে চলে পশু জবাই ও মাংস কাটার কাজ।
ইসলামী শরিয়াহ মোতাবেক কোরবানির পশুর মাংসের তিন ভাগের এক ভাগ সমাজের গরিব ও সাধারণ মানুষের জন্য রাখা হয়। বামন ঘিয়ালা সমাজের নিয়ম অনুযায়ী, সেই এক-তৃতীয়াংশ মাংস সংগ্রহ করে সমাজের অন্তর্ভুক্ত ৩৬২টি পরিবারের মাঝে সম্পূর্ণ সমান ভাগে বণ্টন করে দেওয়া হয়। ফলে গ্রামের ধনী-দরিদ্র প্রতিটি ঘরে ঈদের আনন্দ পৌঁছায় সমভাবে।
“আমাদের বাপ-দাদাদের আমল থেকেই গ্রামে একটি মাত্র সমাজ চলে আসছে। দিন দিন পরিবার সংখ্যা বাড়লেও আমাদের ভেতরের ঐক্য কমেনি, বরং বেড়েছে।”—আব্দুল খালেক ও মজনু মিয়া, স্থানীয় বাসিন্দা।
গ্রামের প্রবীণ ব্যক্তিত্ব আছাব আলী এবং আঃ হান্নান প্রামাণিক জানান, শত বছর ধরে এই নিয়ম চলে আসছে। মাংস কাটাকুটি থেকে শুরু করে বণ্টন—সবকিছুই গ্রামের তরুণ ও যুবকেরা মিলেমিশে উৎসবমুখর পরিবেশে সম্পন্ন করেন।
ব্যক্তিগত স্বার্থ আর সামাজিক বিভেদের এই যুগে উল্লাপাড়ার বামন ঘিয়ালা গ্রামের এই “এক সমাজ” ব্যবস্থা গ্রামীণ ঐক্য ও ভ্রাতৃত্ববোধের এক উজ্জ্বল অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত।

