বাংলাদেশ প্রতিবেদকঃ রাজধানীর মগবাজারের আদ-দ্বীন মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে ৩ ঘণ্টার ব্যবধানে ছয় নবজাতকের আকস্মিক মৃত্যুর ঘটনায় অবশেষে মুখ খুলেছে স্বাস্থ্য বিভাগ। আজ বুধবার (২৭ মে) ভোর ৬টা থেকে সকাল ৯টার মধ্যে হাসপাতালের পোস্ট অপারেটিভ ওয়ার্ডে এই মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে। ঘটনা খতিয়ে দেখতে ইতোমধ্যে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।
ভয়াবহ এই ঘটনার খবর পেয়ে আজ দুপুরে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস এবং অতিরিক্ত মহাপরিচালক (প্রশাসন) অধ্যাপক ডা. মো. জাহিদ রায়হানসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা হাসপাতাল পরিদর্শনে যান।
পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের ব্রিফিংকালে অতিরিক্ত মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. মো. জাহিদ রায়হান বলেন, “আমরা ছয়টি শিশুর মৃত্যুর খবর পেয়েই দ্রুত হাসপাতালে ছুটে এসেছি। ঘটনার প্রকৃত উৎস এবং বিস্তারিত জানার চেষ্টা চলছে। মৃত্যুর সুনির্দিষ্ট কারণ ও কোনো ধরনের চিকিৎসা-অব্যবস্থাপনা ছিল কি না, তা উদঘাটনে উচ্চপর্যায়ের ৩ সদস্যবিশিষ্ট একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটিকে আগামী ৭২ ঘণ্টার (৩ দিন) মধ্যে চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তদন্তে কারও অবহেলা বা গাফিলতি প্রমাণিত হলে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
ঘটনার সময় ওই ওয়ার্ডে দায়িত্বরত নার্স ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের বক্তব্য অনুযায়ী, পোস্ট অপারেটিভ রুমে ১১ জন প্রসূতি মা এবং ৬ জন নবজাতক অবস্থান করছিলেন।
হাসপাতালে থাকা ভুক্তভোগী পরিবার ও স্বজনদের অভিযোগ, ঘটনার সময় ওয়ার্ডের শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র (এসি) বন্ধ ছিল এবং পুরো ঘরে একটি উৎকট ও দমবন্ধ করা দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়ে। নবজাতকেরা অসুস্থ বোধ করলে স্বজনরা নার্সদের জানান। পরবর্তীতে আশঙ্কাজনক অবস্থায় শিশুদের দ্রুত আইসিইউ/এনআইসিইউতে (নবজাতক নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র) স্থানান্তর করা হলেও শেষ রক্ষা হয়নি। স্বজনদের ধারণা, এসির গ্যাস লিকেজ বা কোনো কারিগরি ত্রুটির কারণে সৃষ্ট বিষাক্ত গ্যাসের ফলেই শিশুদের মৃত্যু হয়েছে।
ঘটনার পর পরই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা এবং সিআইডির (আইডিআই) ক্রাইম সিন ইউনিট ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। আলামত সংগ্রহ ও সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণের কাজ শুরু করেছে পুলিশ।
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনার মোসলেহ্ উদ্দিন আহমদ পরিস্থিতির ব্যাখ্যা দিয়ে বলেন, “পোস্ট অপারেটিভ রুমে তীব্র ঠান্ডা অনুভূত হওয়ায় একজন মায়ের অনুরোধে কর্তব্যরত নার্স প্রায় এক ঘণ্টার মতো এসি বন্ধ রাখেন। পরবর্তীতে আবার ঘর গরম হয়ে উঠলে এসি চালু করার কিছুক্ষণের মধ্যেই প্রথমে দুটি শিশু গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়ে। এর পরপরই বাকি চারটি শিশুর অবস্থাও আশঙ্কাজনক হয় এবং চিকিৎসাধীন অবস্থায় একে একে ছয়টি শিশুরই মৃত্যু ঘটে। সিআইডির ক্রাইম টিম বৈজ্ঞানিক আলামত সংগ্রহ করছে। ময়না তদন্ত ও ফরেনসিক রিপোর্টের পর মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নিশ্চিত হওয়া যাবে।”
এর আগে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের রমনা বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) শেখ জাহিদুল ইসলাম ঘটনাস্থল থেকে ছয় নবজাতকের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, পুলিশ পুরো বিষয়টি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করছে।
মগবাজারের আদ-দ্বীন হাসপাতালের এই অনাকাঙ্ক্ষিত ও হৃদয়বিদারক ঘটনায় হাসপাতাল প্রাঙ্গণে এখন শোকার্ত পরিবারগুলোর আহাজারি এবং থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে।

