গিয়াস উদ্দিন সরদারঃ ডিজিটাল প্রযুক্তির ছোঁয়া, স্যাটেলাইট টিভি ও স্মার্টফোনের জয়জয়কারে আজ বিলুপ্তির পথে গ্রামবাংলার প্রাচীন লোকসংস্কৃতি ‘পুঁথিপাঠ’। আবহমান বাংলার এই নিজস্ব ঐতিহ্য ও কৃষ্টিকে নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরতে এবং তা পুনরুজ্জীবিত করার লক্ষ্যে পাবনার চাটমোহরে আয়োজিত হলো এক ব্যতিক্রমী পুঁথিপাঠের আসর।
গতকাল বৃহস্পতিবার রাতে চাটমোহর উপজেলার বিলচলন ইউনিয়নের সোনাহারা পাড়া গ্রামের কিতাব প্রামাণিকের বাড়ির উঠানে এ আসর বসে। চিকিৎসক ও সাংস্কৃতিক সংগঠক এস এম আতিকুল আলমের নেতৃত্বে এবং স্থানীয় একদল তরুণ ও সাংস্কৃতিক কর্মীদের যৌথ উদ্যোগে চমৎকার এই আয়োজন সম্পন্ন হয়।
ডিজিটাল যুগের কৃত্রিম আলোকসজ্জা এড়িয়ে পূর্ণাঙ্গ গ্রামীণ আবহ ও নস্টালজিয়া ফিরিয়ে আনতে আয়োজকেরা গ্রহণ করেন ভিন্নধর্মী পরিকল্পনা। বিদ্যুৎ সংযোগ থাকা সত্ত্বেও পুরো উঠান অন্ধকার রেখে কেবল কুপি, প্রদীপ ও হারিকেনের স্নিগ্ধ আলোয় পরিবেশ তৈরি করা হয়। উঠানে পাতা বাঁশের চাটাই ও পাটিতে বসে আবালবৃদ্ধবনিতা, নারী-পুরুষ মন্ত্রমুগ্ধের মতো রাতের নিস্তব্ধতায় সুরের মূর্ছনা উপভোগ করেন।
অনুষ্ঠানে লোকজ কথাসাহিত্য ও বীরত্বের ঐতিহ্যবাহী পুঁথি থেকে পাঠ পরিবেশন করেন স্থানীয় প্রবীণ ও বিশিষ্ট শিল্পীরা: আসাদুজ্জামান দুলাল (নাট্যব্যক্তিত্ব) পরিবেশন করেন ঐতিহাসিক বীরত্বগাথা ‘হানিফ পালোয়ান ও বিবি সোনাভান’। মো. লইমুদ্দিন প্রামাণিক সুরের আবেশ ছড়িয়ে পাঠ করেন প্রেম ও অলৌকিক উপাখ্যানের পুঁথি ‘গাজী কালু ও চম্পাবতী’।
পুরো অনুষ্ঠানটি অত্যন্ত দক্ষতার সাথে সমন্বয় করেন তরুণ সংগঠক সাজল বিশ্বাস, বিপ্লব আচার্য, নিয়ামুল মুক্তা এবং শিক্ষক আবদুল মান্নান।
অনুষ্ঠানের উদ্যোক্তা ড. এস এম আতিকুল আলম বলেন, “একসময় গ্রামীণ জীবনে দিনের সব ক্লান্তি মেটাতে পুঁথিপাঠ ছিল বিনোদনের প্রধান মাধ্যম। প্রযুক্তির আগ্রাসনে হারানো সেই শিকড়ের সঙ্গে তরুণ প্রজন্মকে পরিচয় করাতেই আমাদের এই প্রচেষ্টা। মানুষের অভূতপূর্ব সাড়া পেয়ে আমরা অভিভূত; চলনবিল অঞ্চলে এই ধারা নিয়মিত অব্যাহত রাখা হবে।”
সংস্কৃতিকর্মী এস এম মিজানুর রহমান শৈশবের স্মৃতিচারণ করে জানান, “একসময় ঘরে ঘরে প্রবীণদের কণ্ঠে পুঁথি শোনা যেত, যা আজ প্রায় বিলুপ্ত। আমাদের ইতিহাস, দর্শন ও লোকসংস্কৃতি টিকিয়ে রাখতে এসব অমূল্য রত্ন সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে সংরক্ষণ করা জরুরি।”

