সন্তানেরা সমাজে সুপ্রতিষ্ঠিত, মা মরলেন চরম অবহেলায়: যুগ্ম সচিব ওএসডি, চার সন্তানকে লিগ্যাল নোটিশ

0
সন্তানেরা সমাজে সুপ্রতিষ্ঠিত, মা মরলেন চরম অবহেলায়: যুগ্ম সচিব ওএসডি, চার সন্তানকে লিগ্যাল নোটিশ

বাংলাদেশ প্রতিবেদকঃ উচ্চশিক্ষিত ও সমাজে চরম প্রভাবশালী সন্তানদের অবহেলা-অযত্নে রাজধানীর মিরপুরের একটি ফ্ল্যাটে ৭৫ বছর বয়সী বৃদ্ধা মা নুরজাহান বেগমের পচাগলা মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় দেশজুড়ে নিন্দার ঝড় উঠেছে। এই মর্মান্তিক ঘটনার জেরে মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের সদস্য (যুগ্ম সচিব) ড. এ কে এম আনিসুর রহমানকে ওএসডি (বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা) করেছে সরকার।

আজ বুধবার (০৩ জুন) বিকেলে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে জারি করা এক প্রজ্ঞাপনে তাঁকে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে সংযুক্ত করার আদেশ দেওয়া হয়। এর আগে সকালে জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী মো. আব্দুল বারী সাংবাদিকদের জানিয়েছিলেন, মায়ের প্রতি অবহেলার কারণে ওই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ‘পিতা-মাতার ভরণপোষণ আইন’ অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

গত রোববার (৩১ মে) জাতীয় জরুরি সেবা ‘৯৯৯’-এ কল পেয়ে মিরপুরের ৬ নম্বর সেকশনের একটি ফ্ল্যাট থেকে পুলিশ নুরজাহান বেগমের মরদেহ উদ্ধার করে। পুলিশ জানায়, ঘরের ভেতর চরম নোংরা পরিবেশে মরদেহটি পচে গিয়ে পোকা ধরেছিল। ধারণা করা হচ্ছে, উদ্ধারের অন্তত ৫ থেকে ৬ দিন আগেই তাঁর মৃত্যু হয়েছিল। জীবনের শেষ দিনগুলো তিনি চরম নিঃসঙ্গতা ও অযত্নে কাটিয়েছেন।

বাসাটি ছিল নুরজাহান বেগমের স্কুলশিক্ষিকা মেয়ের। মায়ের এমন অবমাননাকর মৃত্যুর পর বেরিয়ে আসে তাঁর সন্তানদের উচ্চ সামাজিক মর্যাদার চিত্র। মৃত বৃদ্ধার সন্তানদের মধ্যে রয়েছেন ড. এ কে এম আনিসুর রহমান যুগ্ম সচিব (খুলনা সমুদ্র বন্দর/মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের সাবেক সদস্য)। ড. এ কে এম আশিকুর রহমান অধ্যাপক, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট)। কে এম আতিকুর রহমান কানাডা প্রবাসী। ফাতিমা নাসরিন সুলতানা স্কুলশিক্ষিকা।

এদিকে চার সন্তানের চরম দায়িত্বহীনতা, ভরণ-পোষণে অবহেলা ও আইনি কর্তব্য পালনে ব্যর্থতার জন্য তাদের কাছে ব্যাখ্যা চেয়ে আইনি নোটিশ পাঠিয়েছেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ফারজানা ইয়াসমিন রাখি।

নোটিশ প্রাপ্তির ৭ দিনের মধ্যে এই বিষয়ে সন্তোষজনক ব্যাখ্যা না দিলে বিষয়টি জাতীয় মানবাধিকার কমিশন, সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়, আইনপ্রয়োগকারী সংস্থা এবং উচ্চ আদালতের নজরে এনে কঠোর আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলে জানানো হয়েছে।

লিগ্যাল নোটিশে বলা হয় “বৃদ্ধা নুরজাহান বেগমের মৃত্যু শুধু একটি পরিবারের ট্র্যাজেডি নয়; এটি জাতির বিবেক, মানবিক মূল্যবোধ এবং পারিবারিক দায়িত্ববোধের জন্য এক চরম উদ্বেগ ও ঘৃণার জন্ম দিয়েছে। যে মা সন্তানের জীবন গঠন করেন, সেই মা যদি জীবনের অন্তিম সময়ে নিঃসঙ্গতা ও অবহেলায় মারা যান এবং মৃত্যুর পর মরদেহ আবদ্ধ কক্ষে পোকা-মাকড় কুঁড়ে কুঁড়ে খায়, তবে তা সভ্য সমাজের জন্য গভীর লজ্জা ও বেদনার।”

আইনি নোটিশে উল্লেখ করা হয়, বাংলাদেশের সংবিধানের ১৫, ২৭, ৩১ ও ৩২ অনুচ্ছেদে মানবিক মর্যাদা এবং জীবন-নিরাপত্তার যে সাংবিধানিক নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছে, এই ঘটনা তার পরিপন্থী। এছাড়াও ‘পিতা-মাতার ভরণ-পোষণ আইন, ২০১৩’ অনুযায়ী সন্তানদের ওপর পিতা-মাতার দেখভাল ও পরিচর্যা করার স্পষ্ট আইনি বাধ্যবাধকতা রয়েছে। ফলে এটি কেবল নৈতিক স্খলন নয়, বরং একটি গুরুতর আইনগত অপরাধ।

ঘটনাটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ দেশ-বিদেশে ব্যাপক ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে। একজন উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তা ও বুয়েট শিক্ষকের মতো প্রথম শ্রেণির নাগরিকদের মায়ের এমন পরিণতি সামাজিক নৈতিকতার অবক্ষয়কে মারাত্মকভাবে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে।