এস. এম. সাইফুল ইসলাম কবির: যে বয়সে একটি শিশুর মায়ের আঁচলই হওয়ার কথা পৃথিবীর সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়, যে বয়সে মায়ের কোলে মাথা রেখে ঘুমানোর কথা, সেই বয়সেই মাত্র দুই বছরের এক শিশুকে সড়কের পাশে একা ফেলে চলে যাওয়ার অভিযোগ উঠেছে তার মায়ের বিরুদ্ধে। মায়ের পর দাদির কাছ থেকেও যখন আশ্রয় মেলেনি, তখন অসহায় শিশুটির কান্না আর আহাজারিতে ভারী হয়ে ওঠে পরিবেশ।
শেষ পর্যন্ত স্থানীয় মানুষের মানবিকতায় শিশুটিকে উদ্ধার করে নেওয়া হয় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) বাসভবনে। আর সেখানেই প্রশাসনিক দায়িত্বের গণ্ডি পেরিয়ে এক অনন্য মানবিকতার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন মোরেলগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোঃ হাবিবুল্লাহ। নিজের কোলে তুলে নেন অসহায় শিশুটিকে। শিশুটির পরনে প্রয়োজনীয় পোশাক না থাকায় নিজের বাসা থেকে জামা-কাপড় এনে পরিয়ে দেন। এরপর তার জন্য খাবারেরও ব্যবস্থা করেন তিনি।
হৃদয়বিদারক এ ঘটনাটি ঘটেছে শুক্রবার (২১ আগস্ট) সন্ধ্যা ৬টার দিকে বাগেরহাটের মোরেলগঞ্জ উপজেলার ১৪ নম্বর বারইখালী ইউনিয়নের ২ নম্বর ওয়ার্ডের স্থানীয় জেলে পাড়ার একটি ইটভাটার সামনের সড়কে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, সন্ধ্যার দিকে সড়কের পাশে একা একটি শিশুকে কাঁদতে দেখতে পান স্থানীয় কয়েকজন। কাছে গিয়ে তারা বুঝতে পারেন, শিশুটির পাশে কোনো অভিভাবক নেই। দীর্ঘ সময় ধরে শিশুটির কান্না চলতে থাকায় স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগ সৃষ্টি হয়। পরে তারা শিশুটিকে উদ্ধার করে তার দাদির কাছে নিয়ে যান।
অভিযোগ রয়েছে, শিশুটির দাদিও তার দায়িত্ব নিতে অস্বীকৃতি জানান। ফলে শিশুটিকে আবারও সড়কের পাশে রেখে যাওয়ার মতো নির্মম পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। বিষয়টি দ্রুত এলাকায় ছড়িয়ে পড়লে স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ, বিস্ময় ও গভীর উদ্বেগ দেখা দেয়। একপর্যায়ে স্থানীয়রা শিশুটিকে নিয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার বাসভবনে উপস্থিত হন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, শিশুটির বাবা মো. পলাশ এবং মা মোসা. মিতু আক্তার। তারা বারইখালী ইউনিয়নের ২ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা। স্থানীয় সূত্রের দাবি, প্রায় তিন মাস আগে তাদের মধ্যে বিবাহবিচ্ছেদ ঘটে।
বিবাহবিচ্ছেদের পর শিশুটির দায়িত্ব কার কাছে থাকবে—এ নিয়ে পারিবারিকভাবে জটিলতা তৈরি হয়ে থাকতে পারে বলে স্থানীয়দের ধারণা। তবে মাত্র দুই বছরের একটি শিশুর ওপর সেই পারিবারিক টানাপোড়েনের নির্মম প্রভাব যে কতটা ভয়াবহ হতে পারে, শুক্রবারের ঘটনাটি যেন তারই বাস্তব প্রতিচ্ছবি।
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, শুক্রবার শিশুটির মা মিতু আক্তার তাকে ইটভাটার সামনের সড়কের পাশে রেখে ঢাকার উদ্দেশ্যে চলে যান। কিছুক্ষণ পর শিশুটিকে একা কাঁদতে দেখে স্থানীয়রা এগিয়ে আসেন।
একটি ছোট্ট শিশুর জন্য সেই সময়টুকু কতটা আতঙ্কের ছিল, তা হয়তো ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব নয়। চারপাশে অপরিচিত মানুষ, অথচ নেই মায়ের পরিচিত মুখ; নেই বাবার আশ্রয়, নেই পরিবারের নিরাপদ কোণ।
স্থানীয়রা শিশুটিকে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার বাসভবনে নিয়ে যাওয়ার পর পুরো বিষয়টি জানতে পারেন ইউএনও মোঃ হাবিবুল্লাহ।
ঘটনাটি শোনার পর তিনি শিশুটির বাবার সঙ্গে যোগাযোগ করেন। এ সময় শিশুটির বাবা মো. পলাশ জানান, তিনি বর্তমানে মোরেলগঞ্জের বাইরে অবস্থান করছেন। পরে আইনগত প্রক্রিয়া অনুসরণ করে আগামী তিন দিনের মধ্যে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করে সন্তানকে নিজের দায়িত্বে নেওয়ার কথা জানান তিনি।
কিন্তু আইনগত প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার আগ পর্যন্ত শিশুটির নিরাপত্তা ও প্রয়োজনীয় যত্নের বিষয়টি কী হবে—এই প্রশ্নটি গুরুত্ব দিয়ে দেখেন ইউএনও।
অসহায় শিশুটির দিকে তাকিয়ে তিনি অপেক্ষা করেননি। নিজের কোলে তুলে নেন শিশুটিকে।
শিশুটির পরনে প্রয়োজনীয় পোশাক না থাকায় নিজের বাসা থেকে জামা-কাপড় এনে তাকে পরিয়ে দেন। এরপর শিশুটির জন্য খাবারেরও ব্যবস্থা করেন। একজন প্রশাসনিক কর্মকর্তা যখন সরকারি দায়িত্বের পাশাপাশি একটি অসহায় শিশুর তাৎক্ষণিক প্রয়োজনকে নিজের দায়িত্বের মতো করে দেখেন, তখন সেই দৃশ্য উপস্থিত মানুষের হৃদয় ছুঁয়ে যায়।
শিশুটির সাময়িক নিরাপত্তা ও দেখভালের বিষয়টি নিশ্চিত করতে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা স্থানীয়ভাবে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করেন।
সবার উপস্থিতিতে শিশুটির ফুফু রেসমা খাতুনের কাছে তিন দিনের ভরণ-পোষণের জন্য আর্থিক সহায়তা দিয়ে সাময়িকভাবে শিশুটিকে হস্তান্তর করা হয়।
এতে অন্তত তাৎক্ষণিকভাবে শিশুটির মাথার ওপর একটি নিরাপদ আশ্রয়ের ব্যবস্থা হয়েছে। তবে শিশুটির স্থায়ী ভবিষ্যৎ, অভিভাবকত্ব ও নিরাপত্তা নিয়ে এখনো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া বাকি।
ঘটনার পর শিশুটির বাবা মো. পলাশকে আগামী সোমবার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ে জরুরি ভিত্তিতে উপস্থিত হওয়ার জন্য তলব করা হয়েছে।
শিশুটির ভবিষ্যৎ অভিভাবকত্ব, নিরাপত্তা এবং আইনগত বিষয়গুলো বিবেচনা করে পরবর্তী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
শিশুটির দায়িত্ব শেষ পর্যন্ত কে নেবেন, তার নিরাপদ ভবিষ্যৎ কীভাবে নিশ্চিত করা হবে এবং তার শিক্ষা, চিকিৎসা ও মৌলিক অধিকার কীভাবে সুরক্ষিত থাকবে—এসব বিষয় এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
মাত্র দুই বছরের একটি শিশু। পৃথিবী সম্পর্কে যার জানাশোনা খুব সামান্য। নিজের ভালো-মন্দ বোঝার বয়সও হয়নি। যে বয়সে পরিবারের সদস্যদের ভালোবাসা ও নিরাপত্তার মধ্যেই তার বেড়ে ওঠার কথা, সেই বয়সেই তাকে পড়তে হয়েছে বিচ্ছেদ, প্রত্যাখ্যান আর অনিশ্চয়তার মুখে।
সবশেষে স্থানীয় মানুষের মানবিকতায় এবং উপজেলা প্রশাসনের হস্তক্ষেপে সাময়িক নিরাপদ আশ্রয়।
ঘটনাটি তাই শুধু একটি শিশুকে রাস্তায় ফেলে যাওয়ার ঘটনা নয়; এটি পারিবারিক দায়িত্ববোধ, শিশুর অধিকার, সামাজিক মূল্যবোধ এবং মানবিকতার এক গভীর প্রশ্ন সামনে এনে দিয়েছে।
একদিকে যখন আপনজনদের কাছ থেকেই প্রত্যাখ্যাত হয়ে একটি শিশু সড়কের পাশে অসহায় অবস্থায় পড়ে ছিল, অন্যদিকে তখন প্রশাসনের একজন কর্মকর্তা তার দিকে মানবিকতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন।
ইউএনও মোঃ হাবিবুল্লাহর শিশুটিকে নিজের কোলে তুলে নেওয়া, নিজের বাসা থেকে পোশাক এনে পরিয়ে দেওয়া এবং খাবারের ব্যবস্থা করার বিষয়টি স্থানীয়দের মধ্যে প্রশংসা সৃষ্টি করেছে।
স্থানীয়রা বলছেন, প্রশাসনের দায়িত্ব শুধু আইনশৃঙ্খলা বা সরকারি কার্যক্রম পরিচালনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; মানুষের বিপদে পাশে দাঁড়ানোও একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তার মানবিক কর্তব্য। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে মোরেলগঞ্জ ইউএনওর তাৎক্ষণিক ভূমিকা নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়।
তবে সাময়িকভাবে শিশুটির আশ্রয়ের ব্যবস্থা হলেই দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। শিশুটির প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা, স্থায়ী অভিভাবকত্ব, ভালোবাসাপূর্ণ পারিবারিক পরিবেশ, শিক্ষা ও সুরক্ষা।
স্থানীয়দের প্রত্যাশা, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ শিশুটির সর্বোচ্চ স্বার্থকে গুরুত্ব দিয়ে আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। শিশুটির ভবিষ্যৎ যেন আবার কোনো অনিশ্চয়তা বা অবহেলার মধ্যে না পড়ে, সেটিই এখন সবচেয়ে বড় দাবি।
একটি শিশুর কোনো অপরাধ নেই। বাবা-মায়ের সম্পর্কের টানাপোড়েন, বিচ্ছেদ কিংবা পারিবারিক বিরোধের দায় কোনোভাবেই তার ওপর বর্তাতে পারে না। তার প্রাপ্য হলো নিরাপদ আশ্রয়, স্নেহ, যত্ন ও সুন্দরভাবে বেড়ে ওঠার অধিকার।
মোরেলগঞ্জের এই ছোট্ট শিশুটির কান্না তাই শুধু একটি পরিবারের গল্প নয়—এটি সমাজের বিবেককে নাড়া দেওয়া এক নির্মম বাস্তবতা।
যে শিশুটি সন্ধ্যার আঁধারে সড়কের পাশে পড়ে কাঁদছিল, তার সেই কান্না হয়তো সাময়িকভাবে থেমেছে একজন ইউএনওর মানবিক স্পর্শে। এখন প্রয়োজন সেই মানবিকতার ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করা—যাতে শিশুটির আগামী দিনগুলো আর কখনোই এমন নির্মম অনিশ্চয়তার অন্ধকারে হারিয়ে না যায়।
মানবিকতার হাত বাড়িয়ে দেওয়া একজন সরকারি কর্মকর্তার এই উদ্যোগ যেমন প্রশংসার দাবি রাখে, তেমনি শিশুটির নিরাপদ ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করা এখন পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র—সবার সম্মিলিত দায়িত্ব।

