আন্তর্জাতিক ডেস্কঃ মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ও ইরানকে কেন্দ্র করে চলমান সামরিক অস্থিরতার জের ধরে এবার সৌদি আরবের তেল সমৃদ্ধ পূর্বাঞ্চলীয় শহর দাম্মামের কিং ফাহাদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে প্রাণঘাতী হামলা চালিয়েছে ইয়েমেনের ইরানপন্থি সশস্ত্র গোষ্ঠী হুথি। গত বুধবার রাতের এ ড্রোন ও রকেট হামলায় এক সৌদি নাগরিক এবং এক ভারতীয় নাগরিকসহ মোট দুইজন নিহত এবং অন্তত আটজন গুরুতর আহত হয়েছেন। আন্তর্জাতিক বেসামরিক আকাশসীমায় এমন হামলায় বিশ্বজুড়ে চরম উদ্বেগ তৈরি হয়েছে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে।
ইয়েমেনের বিদ্রোহী গোষ্ঠী হুথিদের সামরিক মুখপাত্র জানিয়েছেন, গত ৪৮ ঘণ্টায় তারা সৌদি আরবের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত ও বেসামরিক স্থাপনায় একযোগে সমন্বিত হামলা চালিয়েছে। তাদের লক্ষ্যবস্তুর তালিকায় ছিল: রিয়াদ: রাজকীয় প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়। ইয়ানবু: বিশ্বখ্যাত রাষ্ট্রায়ত্ত তেল কোম্পানি ‘সৌদি আরামকো’র কৌশলগত স্থাপনা। দাম্মাম ও আভা: গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরসমূহ।
সৌদি বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ দাম্মাম আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতির ঘটনা নিশ্চিত করে জানিয়েছে, সাময়িক বিঘ্ন ঘটার পর বর্তমানে বিমানবন্দরের কার্যক্রম পুনরায় স্বাভাবিক করা হয়েছে। তবে রিয়াদ ও ইয়ানবুর হামলার বিষয়ে রিয়াদ কর্তৃপক্ষ এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে বিস্তারিত মন্তব্য করেনি। অন্যদিকে, সৌদি নেতৃত্বাধীন যৌথ সামরিক জোট জানিয়েছে, তারা রিয়াদ ও পবিত্র নগরী মদিনার আকাশে প্রবেশ করা অন্তত চারটি শত্রুভাবাপন্ন ড্রোন সফলভাবে শনাক্ত করে ধ্বংস করেছে।
কেবল আকাশপথেই নয়, নৌপথেও সংঘাত চরম আকার ধারণ করেছে। ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) পারস্য উপসাগরে তেল পরিবহনে যুক্ত চারটি জাহাজে একযোগে হামলা চালিয়ে আগুন ধরিয়ে দেওয়ার দাবি করেছে। এছাড়া হরমুজ প্রণালির পশ্চিমে আরও তিনটি জাহাজ সামুদ্রিক মাইনের আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
লোহিত সাগরের জুকার দ্বীপ ও বাব আল-মান্দেব প্রণালির কাছে ১৪ জন ভারতীয় নাবিককে বহনকারী একটি নৌযানে হামলা চালানো হয়। হুথিদের দাবি, তারা ভারতীয় নাবিকদের উদ্ধারে কাজ করছে, যা লোহিত সাগরে আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তাকে আবারও বড় হুমকির মুখে ফেলেছে।
হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলে মার্কিন নৌবাহিনীর প্রহরা ও সহায়তা প্রদানকে কেন্দ্র করে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে উত্তাপ চরম সীমায় পৌঁছেছে। আইআরজিসির পক্ষ থেকে এক কঠোর হুঁশিয়ারিতে বলা হয়েছে, মার্কিন সামরিক বাহিনী মাইনযুক্ত বিপজ্জনক জলপথে জাহাজ চলাচলে উস্কানি দেওয়া বন্ধ না করলে মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত সমস্ত মার্কিন সামরিক ঘাঁটি সরাসরি তাদের আক্রমণের আওতায় আসবে।
এদিকে, ইরানের নীতি-নির্ধারণী পর্যালোচনায় দেশটির সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। বৈঠকে জাতীয় প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বৃদ্ধি ও অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলায় জাতীয় ঐক্যের ওপর জোর দেওয়া হয়। একই সঙ্গে দেশটির সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের সচিব মেজর জেনারেল মোহসেন রেজাই এবং বিপ্লবী গার্ড প্রধান আহমদ ওয়াহিদি স্পষ্ট করেছেন যে, মার্কিন অর্থনৈতিক ও সামরিক চাপ ইরানকে নতি স্বীকার করাতে পারবে না।
হরমুজ প্রণালি বন্ধের আশঙ্কা এবং লোহিত সাগর ও পারস্য উপসাগরে একের পর এক তেলবাহী জাহাজে হামলার ঘটনায় বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা প্রবল হয়ে উঠেছে।
আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি ব্যারেল ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম ১১২ ডলার ছাড়িয়েছে, যা গত পাঁচ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ রেকর্ড। যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট অপরিশোধিত তেলের দাম লাফিয়ে ১০০ ডলারের কাছাকাছি পৌঁছে গেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সামরিক ও অর্থনৈতিকভাবে ওয়াশিংটন সুবিধাজনক স্থানে রয়েছে দাবি করে বলেছেন, ইরানের সাথে এ লড়াই মূলত একটি “ছোট সংঘাত” এবং খুব শিগগিরই এ সংকটের সমাধান আসবে। তবে আলোচনা চলার খবর উড়িয়ে দিয়েছেন তিনি।
অপরদিকে, ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু তেহরানে হামলা চালানো সংক্রান্ত পূর্ব পরিকল্পনা ট্রাম্প আটকে দিয়েছিলেন বলে উঠে আসা সংবাদ প্রত্যাখ্যান করেছেন। নেতানিয়াহু স্পষ্ট জানিয়ে দেন, ইরানের বর্তমান শাসনব্যবস্থার পতন ঘটানোই এই অঞ্চলে চিরস্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার একমাত্র উপায়।
ইয়েমেনে দীর্ঘদিনের যুদ্ধবিরতি ভেঙে পড়ার পর থেকে একের পর এক সৌদি বিমানবন্দরে হামলায় চলতি মাসেই মোট ২২ জনের প্রাণহানি ঘটেছে। পরিস্থিতির আশঙ্কাজনক অবনতিতে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে নতুন এক বিশ্ব সংকটের কালো ছায়া ঘনীভূত হচ্ছে।

